
চট্টগ্রাম ব্যুরোঃ চট্টগ্রামের দুর্গম ও অপরাধপ্রবণ এলাকা জঙ্গল সলিমপুরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আসন্ন সফরের মাত্র কয়েক দিন আগে যৌথ বাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্পে এক নজিরবিহীন ও দুঃসাহসিক সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে স্থানীয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। গত রবিবার রাত আনুমানিক ২টার দিকে আলীনগর এলাকায় অন্তত ৩০০ জনের একটি ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত দল এই অতর্কিত হামলা পরিচালনা করে।
হামলাকারীরা কেবল আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রই ব্যবহার করেনি, বরং ভারী যন্ত্রপাতি (বুলডোজার ও এক্সকাভেটর) এনে ক্যাম্পের অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে মূল সড়কসহ এলাকার চারটি সংযোগ সড়ক কেটে প্রশাসনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার অপচেষ্টা চালানো হয়। ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চিরুনি অভিযানে এখন পর্যন্ত ২৫ জন সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়েছে।
র্যাব-৭-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান জানান, হামলাটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। সন্ত্রাসীদের একটি অংশ স্বয়ংক্রিয় একে-৪৭ রাইফেলসহ অন্যান্য আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে ক্যাম্পের চারপাশ থেকে অনবরত গুলিবর্ষণ করতে থাকে, যাতে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা আত্মরক্ষার্থেই ব্যস্ত থাকেন। এই সুযোগে অপর একটি দল বুলডোজার ও এক্সকাভেটর নিয়ে আলীনগর স্কুল এলাকায় স্থাপিত অস্থায়ী ক্যাম্প এবং নির্মাণাধীন নতুন ক্যাম্পের ওপর চড়াও হয়। পাশের পাহাড়ের কিছু টিনশেড ঘরকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এই গোলাগুলি চালানো হয়।
আগামী ৩১ মে জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শনের কথা রয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর। এই সফরকে কেন্দ্র করে ওই এলাকায় একটি নতুন ক্যাম্প নির্মাণ করা হচ্ছিল, যার প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই ক্যাম্পটি উদ্বোধন করারও পরিকল্পনা ছিল। তবে মধ্যরাতের এই সুনির্দিষ্ট হামলায় নির্মাণাধীন স্থাপনাটির সিংহভাগ ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।
আচমকা হামলার শিকার হলেও ক্যাম্পে মোতায়েন থাকা র্যাব ও পুলিশ সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে সাহসিকতার সাথে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে যৌথ বাহিনী সতর্কতামূলক ফাঁকা গুলি ছোড়ে। পরবর্তীতে দ্রুত অতিরিক্ত ফোর্স ঘটনাস্থলে পৌঁছালে হামলাকারীরা পিছু হটে।
র্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পাল্টা প্রতিরোধের সময় সর্বোচ্চ মানবাধিকার ও অপারেশনাল নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে। অত্যন্ত সৌভাগ্যবশত, এই ভয়াবহ সংঘর্ষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্য হতাহত হননি।
ঘটনার পর পর জঙ্গল সলিমপুরে ছুটে যান চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম এবং র্যাব-৭-এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তারা পুরো এলাকা পরিদর্শন করেন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেন।
পুলিশ সুপার মাসুদ আলম সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “জঙ্গল সলিমপুরকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ দিন ধরে একটি চক্রের বিশাল অবৈধ অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল। প্রশাসনের ধারাবাহিক ও কঠোর অভিযানের কারণে তাদের সেই নিয়ন্ত্রণ এখন হাতছাড়া। মূলত নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতেই এই অপরাধী চক্র শেষ চেষ্টা হিসেবে এই প্রতিরোধ গড়ে তোলার দুঃসাহস দেখিয়েছে। তবে এদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। মূল অপরাধী ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের দ্রুতই আইনের আওতায় আনা হবে।”
জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরেই এক দুর্গম ও দুর্ধর্ষ অপরাধের স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত। সরকারি জমি দখল, পাহাড় কাটা এবং অবৈধ অস্ত্র ব্যবসার আখড়া এটি।
সন্ত্রাসীদের হামলায় র্যাবের ডিএডি মোতালেব হোসেন নির্মমভাবে নিহত হন। অপরাধের সাম্রাজ্য ভাঙতে সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ ও বিজিবির প্রায় ৩,২০০ সদস্যের এক বিশাল যৌথ অভিযান চালানো হয়। সেই অভিযানে ২২ জন গ্রেপ্তার হয় এবং এলাকাটি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে আসে। এরপরই এস এম পাইলট উচ্চবিদ্যালয় ও আলীনগর উচ্চবিদ্যালয়ে দুটি অস্থায়ী চৌকি বসানো হয়েছিল।
অভিযান সফল হলেও তালিকাভুক্ত কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী এখনো অধরা থাকায় এলাকাটিতে মাঝে মাঝেই এমন অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা চলছে। বর্তমানে জঙ্গল সলিমপুর এবং এর পার্শ্ববর্তী পাহাড়ি এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক তল্লাশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
