আহম্মদ কবির: টাঙ্গুয়ার হাওর বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি। জীববৈচিত্র্যের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া এই হাওরের ৯,৭২৭ হেক্টর এলাকাকে সরকার প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করেছে। পরিবেশ সংরক্ষণের স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
সম্প্রতি সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন হাউজবোট ও পর্যটকবাহী নৌযান পরিচালনায় একগুচ্ছ বিধিনিষেধ জারি করেছে। এর মধ্যে ইসিএ এলাকায় হাউজবোট চলাচল নিয়ন্ত্রণ,উচ্চ শব্দে গান-বাজনা নিষিদ্ধ,একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বর্জন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার নির্দেশনা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশবিদরা যেসব বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিলেন, সেসব বিষয়ই এবার প্রশাসনিক নির্দেশনায় স্থান পেয়েছে।আইনগতভাবেও এসব পদক্ষেপের ভিত্তি রয়েছে। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন এবং প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০১৬ অনুযায়ী পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ বা নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা সরকারের রয়েছে।পাশাপাশি রামসার কনভেনশনের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রাখার আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতাও বাংলাদেশের রয়েছে। তবে এই উদ্যোগের মাঝেই স্থানীয়দের মাঝে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে। সরকার ঘোষিত ইসিএ এলাকার সুনির্দিষ্ট সীমারেখা কোথায়? তারা মনে করেন,যে এলাকায় বিধিনিষেধ কার্যকর করা হবে,সেই এলাকার অবস্থান ও সীমানা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের অধিকার। কিন্তু বাস্তবে কতজন স্থানীয় বাসিন্দা,পর্যটন উদ্যোক্তা, হাউজবোট মালিক বা পর্যটক জানেন ইসিএর সীমা কোথায় শুরু এবং কোথায় শেষ?
টাঙ্গুয়ার হাওর কেন্দ্রীয় সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতির সাবেক নির্বাহী কমিটির সদস্য অখিল তালুকদার বলেন,টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে সরকার যে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে,তা অবশ্যই সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ। তবে যে এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে,সেই এলাকার সুনির্দিষ্ট সীমারেখা সাধারণ মানুষের কাছে কতটা স্পষ্ট,সেটি বড় প্রশ্ন। সীমারেখা দৃশ্যমান না হলে স্থানীয় বাসিন্দা,জেলে, পর্যটন উদ্যোক্তা কিংবা পর্যটকদের জন্য কোন এলাকায় কী নিয়ম প্রযোজ্য,তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। সংরক্ষণ কার্যক্রমকে কার্যকর করতে হলে শুধু নিষেধাজ্ঞা জারি করলেই হবে না; পাশাপাশি ইসিএ এলাকার মানচিত্র প্রকাশ,মাঠপর্যায়ে সীমানা চিহ্নিতকরণ এবং ব্যাপক জনসচেতনতা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে এবং সাধারণ মানুষ অনিচ্ছাকৃতভাবে নিয়ম লঙ্ঘনের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
স্থানীয় পরিবেশ কর্মী অজিত হাজং বলেন,টাঙ্গুয়ার হাওর শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল।তাই পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে বিধিনিষেধ আরোপ অবশ্যই প্রয়োজন। তবে সংরক্ষণ কার্যক্রমকে সফল করতে হলে প্রথমেই সরকার ঘোষিত ইসিএ এলাকার সুনির্দিষ্ট সীমারেখা স্পষ্ট ও দৃশ্যমান করতে হবে। স্থানীয় মানুষ,জেলে,পর্যটন ব্যবসায়ী,হাউজবোট মালিক কিংবা পর্যটক—কেউ যদি না জানেন কোন এলাকা ইসিএর আওতাভুক্ত, তাহলে বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।তিনি আরও বলেন,সম্প্রতি জেলা প্রশাসকের নির্দেশনায় তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মেহেদী হাসান মানিকের উদ্যোগে টাঙ্গুয়ার হাওরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পরিবেশ সংরক্ষণবিষয়ক সাইনবোর্ড,ফেস্টুন ও বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। পর্যটক ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নেওয়া এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। দীর্ঘদিন ধরে হাওরের পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতা বৃদ্ধির যে প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছিল,এই উদ্যোগ সেই প্রচেষ্টাকে আরও বেগবান করবে।তবে সচেতনতামূলক কার্যক্রমের পাশাপাশি ইসিএ এলাকার সুনির্দিষ্ট মানচিত্র প্রকাশ,সীমারেখা চিহ্নিতকরণ এবং সংরক্ষিত অঞ্চলগুলো দৃশ্যমানভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। এতে পর্যটক, নৌযান চালক, হাউজবোট মালিক ও স্থানীয় জনগণ সহজেই জানতে পারবেন কোন এলাকায় কী ধরনের বিধিনিষেধ কার্যকর রয়েছে। কারণ সংরক্ষণের সফলতা শুধু নির্দেশনা জারির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছতা, কার্যকর তদারকি, জনসম্পৃক্ততা এবং আইনের সমান প্রয়োগ।সীমারেখা স্পষ্ট না হলে আইন প্রয়োগও জটিল হয়ে ওঠে। এতে অনিচ্ছাকৃতভাবে নিয়ম ভঙ্গের ঝুঁকি যেমন বাড়ে, তেমনি সৃষ্টি হয় বিভ্রান্তি ও প্রশ্নের। সংরক্ষণের স্বার্থে বিধিনিষেধ আরোপ করা জরুরি, কিন্তু তার আগে বা অন্তত পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এলাকাকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।স্থানীয়দের মতে,আরেকটি বাস্তবতাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। অতীতেও টাঙ্গুয়ার হাওর রক্ষায় বিভিন্ন সময় নির্দেশনা ও নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল। কিন্তু মাঠপর্যায়ে তদারকি ও ধারাবাহিক বাস্তবায়নের অভাবে সেসব উদ্যোগের অনেকটাই প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি। ফলে নতুন পরিপত্র ঘিরে মানুষের প্রত্যাশার পাশাপাশি সংশয়ও রয়েছে।
টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের সচেতন মহল মনে করে, টাঙ্গুয়ার হাওরকে রক্ষা করতে হলে শুধু নির্দেশনা জারি করলেই হবে না; প্রয়োজন দৃশ্যমান সীমারেখা,উন্মুক্ত মানচিত্র,কার্যকর তদারকি এবং আইনের সমান প্রয়োগ। কারণ সংরক্ষণের সফলতা কেবল কাগজে লেখা বিধিনিষেধে নয়,তার বাস্তব প্রয়োগেই নিহিত।তাদের প্রশ্ন একটাই—সরকার ঘোষিত ইসিএ এলাকার সীমারেখা কতটা স্পষ্ট, আর সেই সীমারেখা নিশ্চিত না করে বিধিনিষেধ কতটা কার্যকর হবে?
টাঙ্গুয়ার হাওরকে ভালোবাসা মানুষেরা এখন নতুন কোনো ঘোষণা নয়,দেখতে চায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং কার্যকর সংরক্ষণ। এ প্রত্যাশা অযৌক্তিক নয়; বরং টাঙ্গুয়ার হাওরের ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্যই তা অপরিহার্য।

