
কুষ্টিয়া প্রতিনিধি: কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় বাউলসম্রাট লালন শাহের মাজার প্রাঙ্গণে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর বর্বরোচিত হামলা ও তার গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। অতর্কিত এই হামলায় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী হাতে আঘাত পেয়ে রক্তাক্ত হওয়াসহ অন্তত ৩ জন আহত হয়েছেন।
রোববার (৪ অক্টোবর) সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে বাউল সাঁইজির আখড়াবাড়িতে গান শোনার ও ফেসবুক লাইভ করার সময় এই ঘটনা ঘটে। এনসিপির দাবি, বিএনপির সহযোগী সংগঠন ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের একটি সশস্ত্র দল তাদের ওপর এই সহিংস হামলা চালিয়েছে।
দলীয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ব্যক্তিগত সফরে কুষ্টিয়ায় এসে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী রোববার দুপুরে কুমারখালীর বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিলাইদহ কুঠিবাড়ি পরিদর্শন করেন। পরে সন্ধ্যায় তিনি নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে ছেঁউড়িয়ায় লালন শাহের আখড়াবাড়িতে প্রবেশ করেন। সেখানে মাজার দর্শন শেষে স্থানীয় বাউল শিল্পীদের গান উপভোগ করার সময় নিজের ফেসবুক আইডি থেকে লাইভ করছিলেন তিনি।
হঠাৎ একদল সন্ত্রাসী ‘ধর ধর’ ধ্বনি তুলে হামলা চালায়। ছেঁউড়িয়ার প্রবেশপথেই তাদের গাড়িবহরে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও অতর্কিত হামলা করা হয়। সন্ত্রাসীরা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে লক্ষ্য করে হামলা চালালে এনসিপি কুষ্টিয়া জেলা শাখার আহ্বায়ক জান্নাতুল ফেরদৌস টনি ও অন্য নেতাকর্মীরা তাকে দ্রুত রক্ষা করতে গেলে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এতে কিছু সময়ের জন্য লালন আখড়া প্রাঙ্গণে তীব্র আতঙ্ক ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও এনসিপি সূত্রে দাবি করা হয়েছে, কুষ্টিয়া পৌর ছাত্রদলের সদস্য ‘সংগ্রাম’-এর নেতৃত্বে এই হামলা ও গাড়ি ভাঙচুর চালানো হয়েছে। ঘটনাটির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে বেশ কয়েকজন যুবককে তেড়ে এসে তাড়া করতে দেখা যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব তারেক রেজা প্রকাশ্যে অভিযোগ তুলে লেখেন, “বিএনপির সন্ত্রাসীরা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর কাপুরুষোচিত হামলা চালিয়েছে।”
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোজাক্কির রাব্বি বলেন, “ছাত্রদল ‘মব’ বা সহিংসতার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। এই হামলার সঙ্গে ছাত্রদলের কোনো নেতাকর্মী জড়িত থাকলে তার দায়ভার কোনোভাবেই সংগঠন নেবে না; ব্যক্তিগতভাবেই তাকে বা তাদের সেই দায় বহন করতে হবে।”
খবর পেয়ে কুমারখালী থানা পুলিশ দ্রুত লালন শাহের মাজার এলাকায় গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে উদ্ধার করে রাত ৮টার দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাহারায় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে মাজার এলাকা ত্যাগ করতে সাহায্য করা হয়। পরে তিনি আইনগত ব্যবস্থার অংশ হিসেবে এজাহার দিতে কুমারখালী থানার উদ্দেশ্যে রওনা হন।
ঘটনা নিয়ে জানতে চাওয়া হলে কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামাল উদ্দিন বলেন, “নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলার খবর পেয়েই আমরা ঘটনাস্থলে গিয়েছি এবং পরিস্থিতি শান্ত করেছি। তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানানো সম্ভব হবে।”
এদিকে, লালন আখড়ায় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলের দপ্তর সেলের সদস্য সাদিয়া ফারজানা দিনার স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ককে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বারবার রাজনৈতিকভাবে হেনস্তা ও প্রাণনাশের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
বিবৃতিতে তার ওপর পূর্বের হামলার চিত্র তুলে ধরে বলা হয় ঢাকার হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ এক অনুষ্ঠানে তাকে উদ্দেশ্য করে উপর্যুপরি ডিম নিক্ষেপ ও শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হয়।
হবিগঞ্জে এনসিপির কর্মসূচি শেষে ফেরার পথে সারজিস আলম ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর গাড়িবহরে হামলা চালানো হয়, যেখানে সারজিস আলমকে ব্যাংকে আশ্রয় নিতে হয়। পরবর্তীতে সিলেটেও তার গাড়ি ভাঙচুর করা হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে এনসিপি জোর দিয়ে জানায়—“রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবেই, কিন্তু তার জবাব সহিংসতা বা গুণ্ডামি দিয়ে দেওয়া কোনো সুস্থ রাজনীতির লক্ষণ হতে পারে না। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কুষ্টিয়ার ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের অতিদ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করতে হবে। দমন-পীড়ন চালিয়ে এনসিপির রাজনৈতিক পথচলা স্তব্ধ করা যাবে না।”
