জয়নাল আবেদীনঃ রংপুরের বহুল আলোচিত অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চার সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যার চাঞ্চল্যকর মামলায় এক যুগান্তকারী ও অকাট্য তথ্য-প্রমাণ হাতে পেয়েছে পুলিশ। অমানবিক এই হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল থেকে জব্দকৃত বিভিন্ন আলামতের সঙ্গে গ্রেপ্তারকৃত দুই আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের সংগৃহীত রক্তের নমুনার পূর্ণ ডিএনএ (DNA) প্রোফাইল হুবহু মিলে গেছে। এ ঘটনায় ঘাতকদের বিচারিক প্রক্রিয়ায় শাস্তির মুখোমুখি করার পথ অনেকটাই সুগম হলো বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) রংপুর মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবির) উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী এই তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি স্পষ্ট জানান, ফরেনসিক ল্যাবের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা আলামতের ডিএনএ-র সাথে ধৃত আসামিদের ডিএনএ সম্পূর্ণ নিখুঁতভাবে ম্যাচ করেছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রোমহর্ষক এই চার খুনের পর ক্রাইম সিন থেকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) স্থানটি কর্ডন করে মোট ৩৫টিরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংগ্রহ করেছিল। এর মধ্যে ছিল রক্তমাখা গামছা, ফল কাটার ধারালো চাকু, ইয়াবা সেবনের ব্যবহৃত ফয়েল পেপার, ফেলে রাখা চাবানো খেজুর, শসার খোসা, ব্যবহৃত সিগারেটের শেষাংশ এবং নান রুটির টুকরো। ঘটনার ১২ দিনের মাথায় পর্যায়ক্রমে তিন দফায় এসব রাসায়নিক আলামত সিআইডির ঢাকাস্ত কেন্দ্রীয় ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়।
ফরেনসিক প্রসেসিংয়ের অংশ হিসেবে গত ২০ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তারকৃত ঘাতক মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থকে রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বিশেষ নিরাপত্তায় ঢাকায় সিআইডি সদর দফতরে নিয়ে আসা হয়। সেখানে বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে তাদের ডিএনএ নমুনা ও রক্তের স্যাম্পল সংগ্রহের পরদিনই ফেরত পাঠানো হয়। এরপর ল্যাবে পাওয়া রক্তের ডিএনএ আলামতগুলোর থেকে সংগৃহীত প্রোফাইলের সাথে নিখুঁতভাবে মিলিয়ে দেখা হলে শতভাগ মিল পাওয়া যায়।
পুলিশ ও ডিবির এজাহার সূত্রে চাঞ্চল্যকর সেই রাতের নৃশংসতার চিত্র উঠে এসেছে। জানা যায়, নারকীয় এই হত্যাকাণ্ডের পর ঘাতক দুজন অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় বাড়ির বাথরুমে গিয়ে নিজেদের গায়ের রক্তের দাগ ধোয়ার জন্য গোসল করে। এরপর তারা ডাইনিং টেবিলে বসে নিশ্চিন্তে ফলমূল, খেজুর ও শসা খায় এবং সঙ্গে আনা ইয়াবা ট্যাবলেট সেবন করে। পরিশেষে ঘর থেকে নগদ টাকা ও বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালংকার লুটপাট করে চম্পট দেয়। চালিত অভিযানে গ্রেপ্তারের পর অভিযুক্ত দুজনই আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে এই চার খুনের হাড়হিম করা বিস্তারিত বর্ণনা প্রদান করেছে।
উল্লেখ্য, তবে গ্রেপ্তারের পর আসামিদের ডোপ টেস্ট করানো হলে নমুনা সংগ্রহে কয়েক দিনের বিলম্ব ঘটার কারণে ল্যাব রিপোর্টে মাদকের উপস্থিতি মেলেনি। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, ঘটনার বেশ কয়েক দিন পর নমুনা নেওয়ায় মেটাবোলাইটস শরীর থেকে অপসারণ হওয়ায় এমন ফলাফল আসাটা স্বাভাবিক।
ভয়াবহ এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির সূত্রপাত ঘটেছিল গত ২২ আগস্ট রাতে। রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ার নিজ বাসভবন থেকে রংপুর জেলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত সম্মানিত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর সহধর্মিণী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), উদীয়মান কন্যা আগামী চক্রবর্তী (২৪) এবং মাত্র ১২ বছর বয়সী ছোট ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীর গলিত ও বিকৃত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
বাড়িটি থেকে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে প্রতিবেশীরা আতঙ্কিত হয়ে থানায় খবর দেন। পুলিশ গিয়ে দোতলা বাড়ির ছাদে টিন দিয়ে ঢাকা অবস্থায় গৃহকর্তা গণপতি চক্রবর্তীর মৃতদেহ, ছাদের সিঁড়ির গেটের আড়ালে তাঁর স্ত্রী ও মেয়ের মরদেহ এবং শোবার ঘরের খাটের তলদেশ থেকে অবুঝ শিশু প্রিয়মের বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করে।
হত্যাকাণ্ডের দ্রুততম সময়ের মধ্যে ভোরেই প্রতিবেশী দুই যুবক সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে আটক করে গোয়েন্দা পুলিশ। এ বিষয়ে অনুষ্ঠিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ জানান, ওই রাতে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ নেশার টানে প্রবীণ শিক্ষক গণপতির বাড়ির ছাদে ওঠে ইয়াবা সেবন করছিল। ছাদে শব্দের উৎস টের পেয়ে গৃহকর্তা খালি গায়ে এবং গলায় গামছা ঝুলিয়ে ওপরে উঠে আসেন। ঘটনা জেনে ফেলায় আসামিরা তাঁরই গলার গামছা পেঁচিয়ে তাঁকে শ্বাসরোধে হত্যা করে। পরে তাঁকে খুঁজতে একে একে স্ত্রী প্রীতিলতা ও মেয়ে আগামী ছাদে এলে তাঁদেরকেও ধারাবাহিকভাবে একই কায়দায় হত্যা করা হয়। শেষে আলামত ঢাকতে বাড়ির সিসিটিভি ক্যামেরার বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে লাশ আড়াল করে ঘরে ঢুকে শিশু প্রিয়মকে হত্যা করে সর্বস্ব লুটে নেয় তারা।

