নিষেধাজ্ঞা তুললেও দুশ্চিন্তা কাটেনি উপকূলীয় জেলের: দস্যুভীতি, ঋণ ও বিষ প্রয়োগের থাবায় সুন্দরবনের জীবিকা

0
নিষেধাজ্ঞা তুললেও দুশ্চিন্তা কাটেনি উপকূলীয় জেলের: দস্যুভীতি, ঋণ ও বিষ প্রয়োগের থাবায় সুন্দরবনের জীবিকা

বাগেরহাট প্রতিনিধিঃ টানা তিন মাসের প্রজননকালীন সরকারি আইনি নিষেধাজ্ঞা শেষে গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে পুনরায় উন্মুক্ত হয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন ও প্রাকৃতিক মৎস্যভান্ডার সুন্দরবনের দ্বার। তবে বনের দুয়ার খুললেও স্বস্তি ফেরেনি সুন্দরবনঘেঁষা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জনপদের হাজার হাজার জেলে পরিবারে। একদিকে বৈরী আবহাওয়া, নদীর ‘মরা কাটাল’ ও চড়া মহাজনি ঋণ; অন্যদিকে সুন্দরবনে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা ডাকাত দলের চাঁদার দাবি ও বিষ দিয়ে অবৈধ মৎস্য শিকারের কারণে উপকূলের বহু জেলের জীবনে এখন চরম অনিশ্চয়তা ও হতাশা বিরাজ করছে।

সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও জলজ প্রাণীর নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে প্রতিবছর ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত বনে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকে। সেপ্টেম্বর থেকে মাছ ও কাঁকড়া আহরণের জন্য ফরেস্ট পারমিট বা বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট (বিএলসি) নেওয়ার সুযোগ পেলেও অর্থাভাবে বনে যেতে পারছেন না অনেক জেলে।

পশ্চিম সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জে নিবন্ধিত বিএলসি রয়েছে ২,৭১৭টি এবং সাতক্ষীরা রেঞ্জে ২,৯০পর্যন্ত মোট ২,৯০০টি। এর মধ্যে কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের ৮৮৪টি বিএলসির বিপরীতে কেবল ৩৪২ জন জেলে প্রবেশের অনুমতি বা পাস সংগ্রহ করতে পেরেছেন।

একটি নৌযানে সাধারণত ২ থেকে ৩ জন জেলে প্রবেশ করেন। তবে দীর্ঘ ৩ মাস আয় বন্ধ থাকায় তেল, বরফ, খাবার ও রেশনের মতো প্রাথমিক খরচ জোগাড় করা অনেক জেলের পক্ষেই অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

উপকূলীয় জেলা বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলা, খুলনার কয়রা ও পাইকগাছা এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনির জেলেদের অভিযোগ—বৃষ্টিপাত, মরা কাটাল (জোয়ার-ভাটার নিম্নপ্রবাহ) এবং ট্রলার মেরামতের ব্যয় মেটাতে না পেরে তারা এখন ঋণগ্রস্ত।

“ভেবেছিলাম ৩ মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে বনে গিয়ে ধার-দেনা শোধ করব। কিন্তু ঋণের টাকা না পাওয়ায় বরফ ও রসদ কিনতে পারছি না, তার ওপর দস্যুদের চাঁদা ম্যানেজ করার ভয় তো আছেই। অনুমতি পেয়েও ঘরে বসে থাকা ছাড়া উপায় নেই।” — আলামিন শেখ, জেলে (কয়রা, খুলনা)

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারিতে একসময় সুন্দরবন দস্যুমুক্ত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে আবারও বিষবৃক্ষের মতো ডালপালা মেলছে ডাকাত দল। পাস নিয়ে বনে ঢোকার আগে ও অবস্থানকালে ট্রলারপ্রতি মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হচ্ছে বলে সাধারণ জেলেরা গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন।

দীর্ঘদিন পর আয়-রোজগারে ফিরেতেই এভাবে অতিরিক্ত অর্থ দাবির ঘটনায় সাধারণ জেলেদের নিরাপত্তা ও বন বিভাগের তদারকি ব্যবস্থা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সুন্দরবনের নির্ধারিত অভয়ারণ্য ও সংরক্ষিত খালে সারাবছর মাছ ধরা নিষিদ্ধ হলেও কিছু অসাধু চক্র ক্ষতিকারক বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার করছে বলে অভিযোগ উঠে এসেছে।

বিষাক্ত কেমিক্যাল প্রয়োগের ফলে রুই, পারসে, ভেটকি কিংবা কাঁকড়ার পোনা ও অন্যান্য জলজ অণুজীব ধ্বংস হচ্ছে। এভাবে অবৈধ প্রক্রিয়ায় মাছ শিকার অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক মৎস্যসম্পদ স্থায়ীভাবে শূন্য হয়ে পড়বে এবং সাধারণ জেলেদের জীবিকা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ায় করমজল, হারবাড়িয়া বা কটকার মতো জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে ভ্রমণপিপাসুদের পদচারণা ও ট্যুর অপারেটরদের ব্যস্ততা হঠাৎ বেড়ে গেছে।

তবে রূপসী সুন্দরবনের এই দুই রূপ উপকূলীয় বাসিন্দাদের জন্য বেশ বৈষম্যমূলক। যেখানে পর্যটকদের জন্য সুন্দরবন কেবল বিনোদন ও প্রকৃতির রূপ উপভোগের স্থান; সেখানে উপকূলের লাখ লাখ মানুষের কাছে এই জঙ্গলই বাঁচা-মরার একমাত্র রসদ।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থকরী শক্তির মূল উৎস এই ম্যানগ্রোভ বন। অবিলম্বে জেলেদের সাশ্রয়ী মূল্যে বনে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করা, বিষমুক্ত উপায়ে মাছ ধরা নিশ্চিত করা এবং বনদস্যু দমন ও মহাজনি ঋণ থেকে জেলেদের রক্ষার কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া না হলে সুন্দরবনের অনন্য জীববৈচিত্র্যের পাশাপাশি এর ওপর নির্ভরশীল উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ স্থায়িত্ব মারাত্মক হুমকিতে পড়বে।