
সাইফুল ইসলাম কবিরঃ মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ এবং ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাবনাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন গতি আনার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে খুলনা ও বাগেরহাট সফর করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) দিনব্যাপী সরকারি সফরে খুলনা ও বাগেরহাট জেলার কয়েকটি উপজেলায় অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করেন তিনি।
সফরকালে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি উপকূলবাসীর প্রধান ও দীর্ঘদিনের মৌলিক সংকট—নদীভাঙন রোধে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, সুপেয় পানির সংকট নিরসন এবং স্থানীয়দের টেকসই জীবিকা নিশ্চিতকরণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেন প্রধানমন্ত্রী।
বৃহস্পতিবার সকালে হেলিকপ্টারযোগে প্রথমে সুন্দরবনের হিরণ পয়েন্টসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চল আকাশপথে পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তাঁর বহনকারী হেলিকপ্টারটি খুলনার দাকোপ উপজেলার নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে অবতরণ করে। সেখানে স্থানীয় সর্বস্তরের জনগণ ও দলীয় নেতাকর্মীরা তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠ এলাকা থেকে লঞ্চঘাট হয়ে নৌপথে মোংলার উদ্দেশে যাত্রা করেন তিনি। দুপুর ১টার দিকে বানৌজা মোংলায় পৌঁছান এবং মধ্যাহ্নবিরতির পর ওয়ার্ডরুমের সভাকক্ষে এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভায় অংশ নেন।
বিকেল ৩টার দিকে প্রধানমন্ত্রী মোংলা বন্দরের জেটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। এরপর বিকেল সোয়া ৩টার দিকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) প্রস্তাবিত মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিদর্শনে যান এবং সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করার বিভিন্ন দিক নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন।
দাকোপের নলিয়ানে প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে সমগ্র উপকূলীয় জনপদে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে সুতারখালী ইউনিয়নসহ আশপাশের নদীভাঙনকবলিত এলাকার অধিবাসীরা স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং নিরাপদ সুপেয় পানির তীব্র সংকট সমাধানের জোরালো দাবি জানান। প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে করমর্দন করেন, তাঁদের জীবনের খোঁজখবর নেন এবং মনোযোগ দিয়ে তাঁদের সমস্যার কথা শোনেন।
উপকূলের মৌলিক সংকট মোকাবিলা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “খুলনাসহ সমগ্র দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সরকার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। উপকূলীয় এলাকার সুপেয় পানির সংকট স্থায়ীভাবে নিরসন এবং নদীভাঙন প্রতিরোধে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে দ্রুত কার্যকর ও দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।”
মোংলা বন্দরের বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া, আধুনিক অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল। সফরকালে মোংলায় ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাবনা নিয়ে বন্দরের কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞ দলের সঙ্গে তিনি মতবিনিময় করেন। শিল্পায়নে জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এর সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়। পাশাপাশি বেজার অধীনে প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে জমি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার গতি ত্বরান্বিত করার নির্দেশ দেন তিনি।
দিনব্যাপী এই গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সফরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সড়ক ও রেলপথ মন্ত্রী রবিউল ইসলাম, জাতীয় সংসদের হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং খুলনা-১ আসনের সংসদ সদস্য আমীর এজাজ খানসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ।
সফরসূচি শেষে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে মোংলা থেকে হেলিকপ্টারযোগে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী। সরকারের পক্ষ থেকে বৃহৎ অর্থনৈতিক প্রকল্প ও মেগা উন্নয়নের পাশাপাশি উপকূলের নদীভাঙন, সুপেয় পানি এবং কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক সমস্যাগুলো বাস্তবায়নে দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সর্বস্তরের মানুষ।
