মরিয়মের হৃদয়বিদারক চিরকুটে বিশ্বাসভঙ্গের তীব্র ক্ষোভ, প্ররোচনা মামলায় এমপি ও ১ম স্ত্রী গ্রেপ্তার

0
মরিয়মের হৃদয়বিদারক চিরকুটে বিশ্বাসভঙ্গের তীব্র ক্ষোভ, প্ররোচনা মামলায় এমপি ও ১ম স্ত্রী গ্রেপ্তার

বাংলাদেশ প্রতিবেদকঃ রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানাধীন ন্যাম ভবনের আবাসিক ফ্ল্যাট থেকে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের (১৯) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) রাতে ৫ নম্বর ভবনের ৩য় তলার ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে মরদেহটি উদ্ধারের পর নিহতের আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে করা মামলায় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম এবং তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগমকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

মরদেহ উদ্ধারের সময় মরিয়মের লেখা বেশ কয়েকটি আবেগঘন ও বিষাদময় চিঠি উদ্ধার করেছে পুলিশ। হস্তলিখিত চিরকুট ও জাতীয় সংসদের অফিশিয়াল প্যাডে লেখা এসব বয়ানে উঠে এসেছে দাম্পত্য সম্পর্কের চরম টানাপোড়েন, বিশ্বাসভঙ্গ এবং প্রতারণার একাধিক নির্মম অভিজ্ঞতা।

উদ্ধার হওয়া চিঠিগুলোতে সরাসরি অভিযোগের পাশাপাশি রূপক ও প্রখর মানসিক যন্ত্রণার কথা ব্যক্ত করেছেন মরিয়ম। সম্পর্কের শেষ পরিণতি নিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘আমি অতি বিশ্বাস করে যুদ্ধে নেমেছিলাম তার সাথে, কিন্তু জিততে পারিনি হেরে গেলাম ময়দানে। জিতবোই বা কেমনে যুদ্ধের শেষ প্রান্তে এসে দেখি তুমিই তো ছিলে বিপক্ষ দলের সেনাপতি।’

অন্য কারো বিবাহিত স্বামীর সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্কে জড়ানোর ভুল ও নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে তিনি লেখেন, ‘সে ছিল অন্য নারীর স্বামী— কাগজে কলমে অধিকার ছিল তার বউ-এর। আর আমি ছিলাম বোকা…!!! অন্য কারো স্বামীকে বানিয়েছিলাম নিজের শখের পুরুষ…!!! কাউকে অর্ধেক পাওয়ার চেয়ে হারিয়ে ফেলা বেশি সম্মানের কারণ… ভালোবাসা কখনোই ভাগ করে নেওয়ার বিষয় নয়… ভালোবাসা হয় সম্পূর্ণ, না হয় অপূর্ণ!’

সম্পর্কের অন্তরালে নিজেকে কেবল ব্যবহৃত এক অনুঘটক হিসেবে উল্লেখ করে একটি পাতায় লেখা রয়েছে, ‘সে বলেছিল— আজ থেকে আমরা বন্ধু–চলো একটা গেমস খেলি। আমিও সরল মনে বিশ্বাস করে রাজি হয়েছিলাম। কিন্তু কে জানতো— আমিই ছিলাম তোমার গেমসের দাবার এক গুটি।’

জাতীয় সংসদের প্যাডে লেখা অপর এক ক্ষোভবার্তায় তিনি লেখেন, ‘আমি হেরেছি— তুমি জিতেছো– কারণ, আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম বলেই তো ঠকিয়ে জিততে পেরেছো… দেখে নাও এই হাসির কারণই হবে তোমার ধ্বংসের কারণ।’

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মামলার সংশ্লিষ্টরা চিঠিগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে বিবেচনা করছেন। তবে চিরকুটে থাকা বক্তব্যগুলোর বিষয়ে আইনি ও রাসায়নিক তদন্তের মাধ্যমে বিস্তারিত সত্যতা নিশ্চিত করা হবে।

মরদেহ উদ্ধারের পর নিহতের বাবা বাদি হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় এমপি গাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগম এবং গাড়িচালককে আসামি করা হয়েছে।

রবিবার দিবাগত রাত ১টার দিকে তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. ইবনে মিজান বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ঘটনাটি জানার পরপরই পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করে। একই সময়ে ন্যাম ভবনে অবস্থানরত এমপি ও তাঁর প্রথম স্ত্রীকে পুলিশি হেফাজতে থানায় নেওয়া হয়। পরে নিহত মরিয়মের বাবার করা মামলার ভিত্তিতে তাঁদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

উল্লেখ্য, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন গাজী নজরুল ইসলাম। তবে চলতি বছরে তাঁর একটি ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে গাজী নজরুল দাবি করেন, ভিডিওতে থাকা তরুণী তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুন।

ভিডিও কেলেঙ্কারির ঘটনায় গত ২২ জুলাই জামায়াতে ইসলামী তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে এবং তাঁর সংসদীয় পদ বাতিল বা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেয়। তবে এখন পর্যন্ত তাঁর জাতীয় সংসদের সদস্যপদ বহাল ছিল। বর্তমানে এমপি ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার পরবর্তী আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।