দেশে আট মাসে মিলল ৩৬ শিশুর লাশ, এখনও নিখোঁজ ২ হাজার

0
দেশে আট মাসে মিলল ৩৬ শিশুর লাশ, এখনও নিখোঁজ ২ হাজার

বাংলাদেশ প্রতিবেদকঃ কুমিল্লায় কোটবাড়ি সীমান্তঘেঁষা ঝোপ থেকে ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের নিথর দেহ উদ্ধারের ক্ষত না শুকাতেই উদ্বেগ বাড়াচ্ছে নিখোঁজ পরবর্তী শিশুহত্যার একের পর এক ভয়াবহ চিত্র। শিশু অপ্রতিম হত্যা কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসেই (জানুয়ারি-আগস্ট) অন্তত ৩৬ জন শিশুর সন্ধান মিলেছে তাদের নিথর মরদেহ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে।

সামাজিক নৈরাজ্য, পারিবারিক কলহ ও চরম নিরাপত্তাহীনতায় বছরের প্রথম আট মাসেই দেশে সর্বমোট ১৫৫ জন শিশু নৃশংসভাবে নিহত হয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থা আসকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নিহত ১৫৫ শিশুর মধ্যে শারীরিক নির্যাতনে মৃত্যু ৬৮ জন, পারিবারিক পরিসরে খুন ৪৯ জন, ধর্ষণের পর নির্মম হত্যা ২৬ জন (যার মধ্যে ২টি ছেলেশিশু), ধর্ষণচেষ্টা, রাজনৈতিক সংঘাত ও অন্যান্য কারণে হত্যা অন্তত ১২ জন

এ ছাড়া সন্দেহজনক মৃত্যু, রহস্যজনক উদ্ধার ও আত্মহত্যার খতিয়ান মিলিয়ে এই সময়ে আরও ৯৯ জন শিশুর মৃত্যু লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

চলতি মাসের শুরুতেই পাবনা সদরে ১০ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করে ডোবায় ফেলে দেওয়া হয়। তার পরদিনই জামালপুরের মাদারগঞ্জে সহপাঠীর বাবার হাতে ধর্ষণের পর খুন হওয়া ৭ বছরের শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয় সহপাঠীর ঘরের মেঝের মাটি খুঁড়ে। জুন থেকে আগস্টের মধ্যে লক্ষ্মীপুর, রংপুর ও সুনামগঞ্জে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে আরও ৭ জন নিষ্পাপ শিশু।

পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে (জানুয়ারি-জুলাই) সারাদেশে ১৫,৭১৭টি শিশু নিখোঁজের জিডি রেকর্ড করা হয়েছে।

উদ্ধার সফলতার হার ৮৭ শতাংশ (১৩,৬৭৯ জন শিশু উদ্ধার), এখনও নিখোঁজ ২,০৩৮ জন শিশু (প্রায় ১৩ শতাংশ), যাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা এখনও অজানা।

পুলিশের বিশ্লেষণ বলছে, শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুরা সাধারণত পথ চিনে না ফিরতে পেরে নিখোঁজ হয়। তবে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে বিষণ্নতা, পড়াশোনার চাপ, প্রেমের টানে আত্মগোপন বা অসৎ সঙ্গের প্রভাবে ঘর ছাড়ার ঘটনা বেশি।

শিশু নিখোঁজের সংবেদনশীলতা নিয়ে চলতি সেপ্টেম্বরে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির জানান, নিখোঁজ হওয়া ৮০ শতাংশের বেশি শিশু পুলিশি তৎপরায় উদ্ধার হলেও বিষয়টি নিয়ে একটি গোষ্ঠী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জনমনে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। অন্যদিকে পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন, বর্তমানে অনলাইন জিডির মাধ্যমে ডিজিটাল নজরদারি, তাৎক্ষণিক ছবিসংগ্রহ ও নিখোঁজদের আপডেটেড ডাটাবেজ তৈরি করে সুরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে।

বাংলাদেশে শিশুদের ওপর এমন ধারাবাহিক নির্মমতার কারণে জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) দায়মুক্তির সংস্কৃতি অবসানের জোর দাবি জানিয়েছে। শিশুবান্ধব বিচারপ্রক্রিয়া এবং স্কুল-মাদ্রাসাসহ সর্বক্ষেত্রে তদারকি বাড়ানোর আহ্বান জানায় সংস্থাটি।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারপারসন ও বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল সমাজে শিশুদের প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধির পেছনে সাংস্কৃতিক চর্চার অভাব ও রাজনৈতিক অস্থিরতাকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, “সমাজে যারা সবচেয়ে দুর্বল ও প্রতিরোধ তৈরি করতে পারে না—নারী ও শিশুরাই নির্যাতনের প্রথম শিকার হয়। শিশুরা অভিযোগ জানাতেও পারে না, ফলে লোকচক্ষুর অন্তরালেই দিনের পর দিন তাদের ওপর নির্যাতন চলে। কেবল বিচার করলেই হবে না, রাষ্ট্রকে নিরপেক্ষভাবে অপরাধীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং ভিকটিম ব্লেমিং বা দোষ চাপানোর মানসিকতা থেকে সমাজকে বেরিয়ে আসতে হবে।”

সারাদেশে চলতি বছরের প্রথম আট মাসে মোট ২,৩৬২টি হত্যাকাণ্ডের মামলা নথিবদ্ধ হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক বিচারের আওতায় না আনলে শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।