খুলনায় অভিযান শেষে রিকশায় ফিরতে গিয়ে ছিনতাইকারীর মুখে পুলিশ পরিদর্শক: ছুরিকাঘাতে রক্তাক্ত, আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকায় স্থানান্তর 

0
খুলনায় অভিযান শেষে রিকশায় ফিরতে গিয়ে ছিনতাইকারীর মুখে পুলিশ পরিদর্শক: ছুরিকাঘাতে রক্তাক্ত, আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকায় স্থানান্তর 

খুলনা ব্যুরো: সন্ত্রাস, মাদক ও ছিনতাই নির্মূলে জেলাজুড়ে পুলিশের জোরদার ‘বিশেষ অভিযান’ চলাকালীন সময়ের মধ্যেই স্বয়ং পুলিশ কর্মকর্তার ওপর নেমে এলো দুর্ধর্ষ ছিনতাইকারী চক্রের নৃশংস হামলা। খুলনায় মধ্যরাতে রূপসা নদীর ওপার থেকে অভিযান শেষ করে ফেরার পথে ছিনতাইকারীদের উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে মারাত্মক আহত ও রক্তাক্ত হয়েছেন জেলা পুলিশের পরিদর্শক শাহ আলম (৪৩)। দুর্বৃত্তরা তার সঙ্গে থাকা দুটি স্মার্টফোন ও নগদ টাকা লুটে নিয়ে পালিয়ে গেছে।

শুক্রবার দিবাগত রাত আনুমানিক ৩টার দিকে খুলনা মহানগরীর সদর থানাধীন ঐতিহ্যবাহী কলেজিয়েট স্কুলের সামনের সড়কে এই রোমহর্ষক ও নিরাপত্তাহীনতার ঘটনাটি ঘটে।

পুলিশের নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, খুলনা জেলা পুলিশের আওতাধীন সীমান্ত ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় চলমান যৌথ অভিযানের অংশ হিসেবে রূপসা নদীর ওপারে একটি সফল অভিযান পরিচালনা করেন পরিদর্শক শাহ আলম। নাইট ডিউটি ও অভিযান শেষে তিনি একটি সাধারণ রিকশায় চেপে একা খুলনা শহরে নিজের গন্তব্যে ফিরছিলেন।

নিস্তব্ধ রাতে রিকশাটি সদর থানার কলেজিয়েট স্কুলের সামনে পৌঁছালে পূর্ব থেকে ওতপেতে থাকা সশস্ত্র ছিনতাইকারী দল তার গতিপথ রোধ করে। ছিনতাইকারীরা মুহূর্তের মধ্যে তার পকেটে থাকা দুটি দামি মোবাইল ফোন ও সঙ্গে থাকা নগদ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালায়। শাহ আলম নিজের পরিচয় দিয়ে দৃঢ়ভাবে বাধা দিলে ক্ষিপ্ত হয়ে ছিনতাইকারীরা তাকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি ধারালো ছুরি দিয়ে কোপাতে শুরু করে।

ছিনতাইকারীদের উপরি-উপরি ছুরিকাঘাতে শাহ আলমের দুই হাত ও পায়ের বিভিন্ন স্থানে মারাত্মক জখম হয়। আত্মরক্ষার চেষ্টা করার সময় সবচেয়ে গুরুতর আঘাতটি লাগে তার হাতের কবজিতে, যেখানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে রগ ও টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।

হামলা চালিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে সড়কে ফেলে রেখে ছিনতাইকারীরা মালামাল লুটে চম্পট দেয়।

ঘটনার পর প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ সত্ত্বেও অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে পরিদর্শক শাহ আলম একই রিকশায় চেপে প্রথমে খুলনা পুলিশ হাসপাতালে ছোটেন। সেখানকার চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে দ্রুত স্থানান্তর করা হয় খুলনা সিটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে।

সেখানে রাতে প্রাথমিক চিকিৎসা ও রক্তক্ষরণ বন্ধের চেষ্টা চালানো হলেও তার শারীরিক অবস্থার অবনতি এবং হাতের কবজির জটিল আঘাতের কারণে শুক্রবার সকালে তাকে জরুরি ভিত্তিতে উন্নত চিকিৎসার উদ্দেশ্যে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স/বিশেষ মেডিকেল সুবিধা নিশ্চিত করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। উল্লেখ্য, তার পরিবারের সদস্যরা স্থায়ীভাবে ঢাকায় বসবাস করেন।

উল্লেখ্য, গত ৬ অক্টোবর থেকে খুলনা জেলা পুলিশের আওতাধীন ৯টি থানা এলাকায় অপরাধ দমন, মাদক নিয়ন্ত্রণ ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে এক অভূতপূর্ব ‘বিশেষ অভিযান’ শুরু হয়েছে। ৭ অক্টোবর এক জমকালো সংবাদ সম্মেলনে খুলনা জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) ওমর ফারুক জানিয়েছিলেন, স্বাভাবিক কার্যক্রমের তুলনায় দ্বিগুণ গতিতে এই চিরুনি অভিযান চালানো হচ্ছে, যেখানে জেলা পুলিশের সাথে এসআরবি-৬ এবং খুলনা মহানগর পুলিশ (কেএমপি) সমন্বিতভাবে কাজ করছে।

অভিযানের আওতায় রূপসা, দিঘলিয়া, তেরখাদা ও বটিয়াঘাটাসহ ৪টি সংবেদনশীল থানাকে ‘অপরাধের হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল এবং আগামী ৭ দিনের মধ্যে খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে বিস্ময়কর ইতিবাচক পরিবর্তন আনার আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন এসপি।

তাছাড়া, গত ৬ অক্টোবর খুলনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর বার্তা দিয়েছিলেন। তিনি সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতের নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি বিপথগামীদের জন্য পুনর্বাসনের সুযোগের কথা জানান।

তবে শীর্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সংসদ সদস্যের এমন কঠোর হুঁশিয়ারির মাত্র কয়েক দিনের মাথায় খোদ অভিযানের দায়িত্বে থাকা পরিদর্শকের ওপর এই নৃশংস হামলায় খুলনার সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি নতুন করে বড় ধরণের প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

এ বিষয়ে খুলনা জেলা এসপি ওমর ফারুক জানান, “পুলিশ কর্মকর্তা শাহ আলমের ওপর হামলার ঘটনাটি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। জঘন্য এই ছিনতাইয়ের ঘটনায় জড়িত দুষ্কৃতকারীদের শনাক্ত করে গ্রেফতার এবং লুন্ঠিত মালামাল উদ্ধারে খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) একাধিক গোয়েন্দা টিমকে সাথে নিয়ে সমন্বিত যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।”

খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লোকমান হোসেন জানান, অপরাধীদের পালানোর সম্ভাব্য পথগুলোর সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে এবং ঘটনার পর থেকেই নগরীর বিভিন্ন মোড়ে পুলিশি তল্লাশি ও আসামিদের গ্রেফতারে সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়েছে। খুব দ্রুতই অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।