রাশিয়া-বাংলাদেশ ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব প্রসঙ্গে

0

রফিক সুলায়মান: রাশিয়া ১৯৭১ এর মতো আবারও বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। না, এবার সপ্তম নৌবহরের পালটা জবাব দিতে নয়। এবার এক মার্কিন কূটনীতিকের শিষ্টাচার বহির্ভূত আচরণের জবাব দিতে ঢাকাস্থ রাশিয়ান দূতাবাস মুখ খুলেছে। মুখ খুলেছে মস্কোর ফরেন অফিসের মুখপাত্রও। আর এটা সম্ভব হয়েছে প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পদগোর্নির সুযোগ্য উত্তরসূরী ভ্লাদিমির পুতিনের মতো একজন শাসককে রাশিয়া পেয়েছে বলেই। ১৯৭১ এ মার্কিন-পাকিস্তান অক্ষের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পদগোর্নি; আর এবার দাঁড়ালেন পুতিন।

গতকাল বিতর্কিত প্রবাসী ইউটিউবার পিনাকী ভট্টাচার্য্য রুশ-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে একটি ঘৃণাসূচক ভিডিও প্রকাশ করেছে। সেখানে এক লেখকের রচনা থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলতে চেয়েছে, জিয়া-এরশাদ আমলে রাশিয়ার সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক এতোই খারাপ ছিলো যে বাংলাদেশ প্রায়ই রাশিয়ান কূটনীতিকদের বহিস্কার করতো। কিন্তু একই লেখকের লেখায় রাশিয়া-বাংলাদেশের সম্পর্কের ঐতিহাসিক ও ইতিবাচক অংশটুকু বেমালুম পাশ কাটিয়ে গেছে।

বিশ্বের এক মহাপরাক্রমশালী সোভিয়েত ইউনিয়নের পূর্বের অবস্থান তৈরি করতে দৃঢ় রাশিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। অনেকটাই সফলতার পথে আছেন এই ইতিবাচক একনায়ক।

বাংলাদেশের সাথে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং বর্তমান রাশিয়ার সম্পর্ক ঐতিহাসিক ভাবেই বিদ্যমান।আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিজয়ের পর ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। পরদিনই কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। তবে সম্পর্কের বীজ আরো পূর্ব হতেই বপন করা হয়। যা স্বাধীনতা লাভের পর আরো বিকশিত হয়।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সোভিয়েত ইউনিয়ন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী কর্তৃক সংঘটিত গণহত্যার নিন্দা জানায় এবং গণহত্যা বন্ধ করার জন্য পাকিস্তান সরকারকে আহ্বান জানায়। যুদ্ধ চলাকালে সোভিয়েত ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধাদের বিস্তৃত সামরিক ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করে।

যুদ্ধের শেষদিকে পাকিস্তান যখন প্রায় পরাজিত তখন পাকিস্তানকে সহায়তা করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গোপসাগর অভিমুখে মার্কিন সপ্তম নৌবহর প্রেরণ করার অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত নেয়। এর প্রত্যুত্তরে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর প্রতি সম্ভাব্য মার্কিন হুমকি প্রতিহত করার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর এবং ১৩ ডিসেম্বর ভ্লাডিভোস্তক থেকে সোভিয়েত প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবহরের দুই স্কোয়াড্রন ক্রুজার ও ডেস্ট্রয়ার এবং পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত একটি পারমাণবিক ডুবোজাহাজ প্রেরণ করে। সোভিয়েত নৌবহরটির নেতৃত্বে ছিলেন অ্যাডমিরাল ভ্লাদিমির ক্রুগ্লিয়াকভ। সোভিয়েত নৌবহরের তৎপরতার ফলে মার্কিন নৌবহর চালকদের পাতলা পায়খানা শুরু হয়। ফলে পাকিস্তানকে সহায়তা না করে পিছু হটে। এছাড়া সোভিয়েত নৌবাহিনী গোপনে ভারতীয় নৌবাহিনীকে সহায়তা করে এবং পাকিস্তান নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে গুপ্ত অভিযান পরিচালনা করে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরবর্তী বছরগুলোতে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের বিশেষ সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। যুদ্ধের পর সোভিয়েত নৌবাহিনী যুদ্ধবিধ্বস্ত চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে মাইন অপসারণ এবং বন্দরটির কার্যক্ষমতা পুনরুদ্ধারের কাজে ব্যাপক সহযোগিতা করেন। সোভিয়েত প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবহরের ২২টি জাহাজ এ উদ্দেশ্য ১৯৭২ সালের মে মাসে দূর প্রাচ‍্যের ভ্লাদিভোস্তক বন্দর থেকে চট্টগ্রামে আসে। মাইন অপসারণের কাজটি সম্পন্ন করতে তাদের প্রায় এক বছর সময় লাগে, এবং ইউরি রেদকিন নামক একজন সোভিয়েত মেরিন এসময় মাইন বিস্ফোরণে প্রাণ হারান। বাংলাদেশ নেভাল একাডেমি প্রাঙ্গণে তার কবর অবস্থিত। অর্থাৎ স্বাধীন বাংলাদেশের পূণর্গঠনে রাশিয়া রক্তও ঝরিয়েছে। রক্তের ঋণে আবদ্ধ রাশিয়া।

সোভিয়েত ইউনিয়ন নবপ্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ বিমানবাহিনীকেও ব্যাপক সহায়তা প্রদান করে।বিশেষত সোভিয়েত সরকার বাংলাদেশ বিমানবাহিনীকে ১০টি এক-আসনবিশিষ্ট মিগ-২১এমএফ এবং ২টি দুই-আসনবিশিষ্ট মিগ-২১ইউএম যুদ্ধবিমান উপহার প্রদান করে। ১৯৭২ সালের মার্চে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মস্কো সফর করেন। বর্তমান সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমে রাশিয়ার রয়েছে বিরাট অংশগ্রহণ। রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রকে ঘিরে সেখানে গড়ে উঠেছে ‘মিনি রাশিয়া’ কেন্দ্র। রাশিয়া ভাষা শেখার প্রতিযোগিতা চলছে সেখানে।

এটা অত্যন্ত দুঃখজনক যে বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর রাশিয়ার সাথে সম্পর্কের সেতুটিকে ভেঙে ফেলে। জিয়া-এরশাদ বিভিন্ন সময় রাশিয়ান কূটনীতিকদের বহিস্কার করে। জিয়াউর রহমান তো মস্কো অলিম্পিকে বাংলাদেশ ক্রীড়া প্রতিনিধিও পাঠান নি।

রাশিয়া একাত্তরেও আমাদের পাশে ছিলো। আজো আছে। পিনাকীদের এখানেই এলার্জি। পিনাকী যাদের উদ্দেশ্য হাসিল করছে তাদেরও এখানে এলার্জি।

(তথ্যসূত্র : বিভিন্ন গ্রন্থ ও সাময়িকী)

রফিক সুলায়মান : লেখক ও শিল্প-সমালোচক