হাওরের শিক্ষা ব্যবস্থা কোন পথে?

0
হাওরের শিক্ষা ব্যবস্থা কোন পথে?
তাহিরপুর প্রতিবেদক: হাওরের ভোরের একটি আলাদা সৌন্দর্য আছে। কুয়াশা ভেদ করে সূর্যের আলো যখন টাঙ্গুয়ার হাওরের জলরাশিতে পড়ে, তখন মনে হয় প্রকৃতি যেন নতুন দিনের স্বপ্ন আঁকছে। সেই স্বপ্নেরই অংশ ছোট ছোট কিছু শিশু।কেউ বই হাতে, কেউ খাতা বগলে, কেউ নৌকায় চড়ে বিদ্যালয়ের পথে। তাদের চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন।কিন্তু সেই স্বপ্ন আর বাস্তবতার মাঝখানে এখনও রয়ে গেছে অনেক দীর্ঘ পথ।
টাঙ্গুয়ার হাওরের পাড়ঘেঁষা জয়পুর, গোলাবাড়ি ও ইসলামপুর গ্রামের কিছু শিশুকে পর্যটনের মৌসুমে ছোট ছোট নৌকা নিয়ে পর্যটকবাহী হাউজবোটের পাশে যেতে দেখা যায়। তারা লোকগান গায়, ভাটিয়ালি শোনায়, কেউবা পর্যটকদের অনুরোধে গান পরিবেশন করে। বিনিময়ে হাতে আসে সামান্য কিছু টাকা।পর্যটকদের কাছে এটি হয়তো বিনোদনের একটি মুহূর্ত, কিন্তু সমাজের কাছে এটি একটি কঠিন প্রশ্ন—একজন শিশুর সবচেয়ে বড় পরিচয় কি পর্যটকদের বিনোদন দেওয়া, নাকি বিদ্যালয়ের বেঞ্চে বসে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা?
এই প্রশ্ন কোনো শিশুকে দোষারোপ করার নয়। বরং এটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, সামাজিক বাস্তবতা এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
হাওরাঞ্চলের বহু পরিবারের কাছে দারিদ্র্য এখনও একটি কঠিন বাস্তবতা। সেই বাস্তবতার চাপেই অনেক শিশুই প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডি পেরোনোর আগেই বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ে। কেউ বাবার সঙ্গে হাওরে মাছ ধরতে যায়,কেউ দিনমজুরির কাজে যুক্ত হয়, কেউ পর্যটনের মৌসুমে সামান্য আয়ের আশায় হাউজবোটের পাশে গান গেয়ে বেড়ায়। একটি শিশুর হাতে যখন বইয়ের বদলে জাল কিংবা বৈঠা উঠে আসে, তখন হারিয়ে যায় শুধু একটি শিক্ষার্থী নয়; হারিয়ে যেতে থাকে একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ।প্রশ্ন হলো, এই ঝরে পড়া শিশুদের সঠিক সংখ্যা কি শিক্ষা প্রশাসনের কাছে রয়েছে? কেন তারা বিদ্যালয় ছাড়ছে, কতজনকে পুনরায় বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনা গেছে, কী ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে—এসব বিষয়ে কি নিয়মিত অনুসন্ধান ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে? যদি হয়ে থাকে, তাহলে তার দৃশ্যমান ফল কোথায়?
সম্প্রতি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ তাহিরপুর উপজেলার শাহগঞ্জ, সোলেমানপুর,পাঠাবুকা ও জয়পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন। তিনি সরাসরি শ্রেণিকক্ষে গিয়ে শিক্ষার্থীদের বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের দক্ষতা যাচাই করেন। পরিদর্শন শেষে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, শিক্ষার মান নিয়ে কাগুজে রিপোর্ট নয়, মাঠের বাস্তব ফলাফল চাই।
পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি আরও লিখেছেন,নিয়মিত তদারকির দাবি থাকলেও অনেক শিক্ষার্থী এখনও বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে প্রত্যাশিত দক্ষতা অর্জন করতে পারেনি। অনেক প্রতিবেদনের সঙ্গে বাস্তবতার অসঙ্গতিও ধরা পড়েছে। তাই ভুল তথ্য,দায়সারা তদারকি কিংবা শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি আড়াল করার কোনো সুযোগ নেই।এই বক্তব্য হাওরবাসীর মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের নানা পরিসংখ্যান শোনা গেলেও সাধারণ মানুষ এখন জানতে চায়—শিশুরা আসলে কতটা শিখছে?
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, তাহিরপুর উপজেলায় ১৩৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এই বিদ্যালয়গুলোই হাওরাঞ্চলের শিক্ষার ভিত্তি। কিন্তু বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়লেই শিক্ষার মান নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন প্রতিটি বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান, কার্যকর একাডেমিক তদারকি, দক্ষ শিক্ষক, সক্রিয় প্রধান শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের শেখার অগ্রগতি নিয়মিত মূল্যায়নের ব্যবস্থা।বছরের একটি বড় সময় হাওরাঞ্চল জলবেষ্টিত থাকে। অনেক শিক্ষার্থীকে প্রতিদিন নৌকায় করে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। কোথাও দীর্ঘ জলপথ,কোথাও প্রতিকূল আবহাওয়া, কোথাও পারিবারিক দারিদ্র্য—এসব চ্যালেঞ্জ বাস্তব। কিন্তু এসব বাস্তবতা কখনো মানসম্মত শিক্ষা থেকে শিশুদের বঞ্চিত হওয়ার কারণ হতে পারে না। বরং এমন এলাকায় আরও বেশি পরিকল্পনা, তদারকি এবং দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন।
গত এক দশকে বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে হাওরাঞ্চলের শিক্ষা নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিদ্যালয়ে যাতায়াতের দুর্ভোগ, শিক্ষকসংকট, অনিয়মিত উপস্থিতি,ঝরে পড়া শিক্ষার্থী এবং শিখনফলের বৈষম্যের বিষয়গুলো উঠে এসেছে। একই সঙ্গে অনেক নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকের কথাও এসেছে,যারা প্রতিকূলতার মধ্যেও দায়িত্ব পালন করে শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে রেখেছেন। অর্থাৎ সংকট যেমন রয়েছে, তেমনি সম্ভাবনাও রয়েছে।
এখন প্রয়োজন প্রতিটি বিদ্যালয়ের বাস্তব অবস্থা খোলামেলাভাবে মূল্যায়ন করা। কোথায় শিক্ষকস্বল্পতা রয়েছে, কোথায় শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে, কোথায় পাঠদানের মান দুর্বল—এসব তথ্য গোপন না করে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ সমস্যা লুকিয়ে রাখলে সমস্যার সমাধান হয় না।
হাওরের মানুষ নতুন প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না। তারা দেখতে চায় বিদ্যালয়ে শিক্ষকের উপস্থিতি, শ্রেণিকক্ষে প্রাণবন্ত পাঠদান, নিয়মিত একাডেমিক তদারকি এবং শিক্ষার্থীদের শেখার দৃশ্যমান উন্নতি। তারা দেখতে চায়,জয়পুর, গোলাবাড়ি কিংবা ইসলামপুরের কোনো শিশুই যেন আর সামান্য আয়ের জন্য পর্যটকদের সামনে গান গাইতে বাধ্য না হয়; বরং সেই শিশুই একদিন বিদ্যালয়ের মঞ্চে দাঁড়িয়ে কবিতা আবৃত্তি করুক, বিজ্ঞান মেলায় অংশ নিক,নিজের মেধা দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিক।
আজ প্রশ্নটি শুধু হাওরের শিক্ষা ব্যবস্থা কোন পথে?”—এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, হাওরের প্রতিটি শিশুর জন্য আমরা কেমন ভবিষ্যৎ গড়ে দিতে চাই?
যদি এক মাসের এই উদ্যোগ কেবল নির্দেশনায় সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব পরিবর্তনে রূপ নেয়,যদি প্রতিটি বিদ্যালয়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়, যদি ঝরে পড়া শিশুদের আবার বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে একদিন হয়তো হাওরের জলরাশির মতোই বিস্তৃত হবে এই জনপদের শিক্ষার সম্ভাবনা।
কারণ হাওরের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় প্রকল্প কোনো সড়ক, সেতু বা ভবন নয়। হাওরের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হওয়া উচিত একটি শিশুর শিক্ষা। আর সেই বিনিয়োগ সফল হলেই বদলে যাবে শুধু একটি বিদ্যালয় নয়—বদলে যাবে পুরো হাওর, বদলে যাবে আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ।