টিকাদান কর্মসূচিতে ধস: বাংলাদেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কবার্তা

0
 টিকাদান কর্মসূচিতে ধস: বাংলাদেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কবার্তা

বাংলাদেশ প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশে হামের সাম্প্রতিক ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের পেছনে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির স্থবিরতা এবং টিকার তীব্র সংকটকে দায়ী করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)। সংস্থাটির মতে, দীর্ঘদিনের অর্জিত সাফল্যের ধারা গত দুই বছরে ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে, যা দেশকে এক জনস্বাস্থ্য সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

গত ২৩ এপ্রিল প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের শুরু থেকেই বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সংক্রমণের বিস্তার এখন আর নির্দিষ্ট কোনো এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই। দেশের ৮টি বিভাগের সবগুলো এবং ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৮টিতেই হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে।

২০২৬ সালের ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল—মাত্র এক মাসে সন্দেহভাজন ১৯,১৬১ জন রোগীর তথ্য পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ২,৯৭৩ জনের শরীরে নিশ্চিতভাবে ভাইরাসের উপস্থিতি মিলেছে। এই সময়ের মধ্যে হাম ও হাম-সংশ্লিষ্ট জটিলতায় ১৬৬টি সন্দেহজনক মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ৩০টি মৃত্যু ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ হাম নির্মূলের পথে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছিল। ২০২৪ সালে দ্বিতীয় ডোজ টিকার কভারেজ ছিল ১২১ শতাংশ। তবে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গত দুই বছরে সেই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে। বিপর্যয়ের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ২০২৪-২৫ সালে হাম-রুবেলা (MR) টিকার নজিরবিহীন সংকট। নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে চরম শিথিলতা ও অব্যবস্থাপনা। ২০২০ সালের পর বড় পরিসরে কোনো গণটিকাদান অভিযান না হওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ শিশুর সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যারা আক্রান্ত হচ্ছে তাদের ৯১ শতাংশের বয়স ১ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, মৃত শিশুদের সিংহভাগই ২ বছরের কম বয়সী এবং তারা কোনো টিকাই পায়নি।

আক্রান্তদের বড় অংশ হয় সম্পূর্ণ টিকাবিহীন, নয়তো মাত্র এক ডোজ টিকা পেয়েছিল। কিছু শিশু ৯ মাস বয়সের আগেই আক্রান্ত হচ্ছে, যা নির্দেশ করে যে মায়েদের মাধ্যমে শিশুদের শরীরে আসার মতো পর্যাপ্ত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও এখন সমাজে নেই।

হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এর জটিলতায় শিশুদের নিউমোনিয়া, অন্ধত্ব, এনসেফালাইটিস এমনকি মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে বলেছে “যদি দ্রুত নজরদারি জোরদার করা না হয় এবং বাদ পড়া শিশুদের জরুরি ভিত্তিতে টিকার আওতায় আনা না যায়, তবে এই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।”

সংস্থাটি মনে করছে, বর্তমান প্রাদুর্ভাব বাংলাদেশের টিকাদানের দীর্ঘদিনের গৌরবোজ্জ্বল অর্জনকে ধূলিসাৎ করে দেওয়ার উপক্রম হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দ্রুত সরকারকে একটি ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ বা জরুরি গণটিকাদান কর্মসূচি হাতে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।