আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ দীর্ঘ ৪০ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত আর কূটনৈতিক টানাপড়েনের পর অবশেষে আলোচনায় বসছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অনুষ্ঠেয় এই হাই-প্রোফাইল বৈঠকে ইরান তাদের প্রস্তাবিত ‘১০ দফা পরিকল্পনা’-কে আলোচনার প্রধান শর্ত হিসেবে ঘোষণা করেছে।
শুক্রবার (১০ এপ্রিল) তেহরানে নিযুক্ত বিদেশি রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সাথে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাজিদ তাখত রাভানচি।
উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাভানচি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ইরান সংলাপের পক্ষে থাকলেও তা হতে হবে স্বচ্ছ ও সম্মানজনক। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরান এমন কোনো ‘ঠুনকো’ যুদ্ধবিরতিতে রাজি হবে না যা শত্রুকে পুনরায় শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ করে দেয়। তিনি বলেন, “কোনো সুনির্দিষ্ট গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা ছাড়া বর্তমান পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হতে দেওয়া হবে না। আমরা যুদ্ধের অবসান চাই, তবে তা আমাদের সার্বভৌমত্বের বিনিময়ে নয়।”
বৈঠকে রাভানচি গত দেড় মাসের সংঘাতের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করেন, যখন জেনেভায় কূটনৈতিক আলোচনার পথ খোঁজা হচ্ছিল, তখনই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সৈয়দ আলী খামেনি ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর কাপুরুষোচিত হামলা চালিয়ে তাদের শহীদ করেছে। তিনি একে চরম ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করেন।
ইরানের ‘১০ দফা’ পরিকল্পনার মূল স্তম্ভঃ
ইসলামাবাদ বৈঠকে ইরান যে দাবিগুলো জোরালোভাবে উত্থাপন করবে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল থেকে সমস্ত মার্কিন সামরিক শক্তি সম্পূর্ণ প্রত্যাহার। ইরানের ওপর আরোপিত সকল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা একতরফাভাবে প্রত্যাহার। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের সার্বভৌম ও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। ভবিষ্যতে আর কখনো ইরানি ভূখণ্ডে আগ্রাসন চালানো হবে না—এমন আন্তর্জাতিক আইনি নিশ্চয়তা প্রদান।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই অসম যুদ্ধের স্মৃতি চারণ করে রাভানচি বলেন, ইরান একা দুটি পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র ও বিশাল বিশ্ববাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। তিনি দাবি করেন, জনগণের ইস্পাতকঠিন ঐক্য এবং সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিরোধের মুখে আক্রমণকারীরা তাদের কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। গত ৮ এপ্রিল ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ এই সংঘাতকে ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ হিসেবে ঘোষণা করেছে।
আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনে রাভানচি প্রতিবেশী দেশগুলোকে আশ্বস্ত করে বলেন, ইরানের সামরিক পদক্ষেপ কেবল শত্রুঘাঁটির বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়েছে, যা কোনো ভ্রাতৃপ্রতিম রাষ্ট্রের জন্য হুমকি নয়। তবে তিনি কিছু ইউরোপীয় দেশের একপেশে ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় বর্তমানে দুই সপ্তাহের একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চলছে। ইসলামাবাদে এই আলোচনার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ মানচিত্র। তেহরান একে ‘কূটনৈতিক লড়াইয়ের অংশ’ হিসেবে দেখলেও বিশ্ববাসী তাকিয়ে আছে এই বৈঠকের ফলাফলের দিকে।
সূত্র: তাসনিম নিউজ এজেন্সি, রয়টার্স ও ডন।

