
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বুধবার পারস্য উপসাগরের বন্দর আব্বাসে মার্কিন বিমান হামলার পর, তার তীব্র ও সরাসরি জবাব দিয়েছে তেহরান। যুক্তরাষ্ট্রের ওই আগ্রাসনের জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত একটি কৌশলগত মার্কিন বিমানঘাঁটিতে জোরালো হামলা চালিয়েছে ইরানের এলিট ফোর্স ‘ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী’ (আইআরজিসি)। এই ঘটনার পরপরই পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে সর্বোচ্চ যুদ্ধসতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং মিত্রদেশ কুয়েতে মার্কিন বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতের খবর পাওয়া গেছে।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ‘তাসনিম’-এ প্রকাশিত এক জরুরি বিবৃতিতে আইআরজিসি এই প্রতিশোধমূলক হামলার ঘোষণা দেয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, স্থানীয় সময় আজ বৃহস্পতিবার (২৮ মে) ভোর ৪টা ৫০ মিনিটে মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে। আইআরজিসি ওই নির্দিষ্ট ঘাঁটিটিকে ইরানের ওপর চালানো মার্কিন ‘আগ্রাসনের মূল উৎস’ হিসেবে অভিহিত করেছে। তবে সামরিক গোপনীয়তার কারণে ঘাঁটিটির নাম বা ভৌগোলিক অবস্থান প্রকাশ করেনি তেহরান।
আইআরজিসি স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে “যেকোনো বিদেশি আগ্রাসনের জবাব দিতে ইরান বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না। ওয়াশিংটন যদি এরপর আর কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ধৃষ্টতা দেখায়, তবে পরবর্তী জবাব হবে আরও বহুগুণ কঠোর ও বিধ্বংসী।”
ইরানের এই হামলার ঘোষণার পরপরই কুয়েতজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কুয়েতের জাতীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, দেশটিতে ভোররাত থেকে যুদ্ধকালীন সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানো হচ্ছে।
কুয়েত সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা (Air Defense System) বর্তমানে অত্যন্ত সক্রিয় রয়েছে এবং তারা দেশটির আকাশে ‘শত্রুপক্ষের ধেয়ে আসা একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা’ মোকাবেলা করছে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোই হয়তো ইরানের মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল।
এই পাল্টাপাল্টি হামলার সূত্রপাত হয় স্থানীয় সময় বুধবার (২৭ মে), যখন মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের বন্দর আব্বাসের বিমানবন্দর ও উপকণ্ঠের একটি সামরিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালায়।
পেন্টাগনের দাবি, ওই স্থাপনাটি হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন নৌবাহিনী এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য ‘তাত্ক্ষণিক হুমকি’ তৈরি করছিল। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, হামলার পাশাপাশি তারা বেশ কয়েকটি ইরানি ড্রোনও মাঝআকাশে ভূপাতিত করেছিলেন। এর আগে গত সোমবার (২৫ মে)-ও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রে তথাকথিত ‘প্রতিরক্ষামূলক হামলা’ চালিয়েছিল মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM)।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত এমন এক সময়ে তীব্র রূপ নিল যখন ওমানের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের মধ্যে তিন মাস ধরে চলা যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলছিল।
হামলার ঠিক আগের দিন বুধবার, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ওমানের শান্তি আলোচনার একটি গুঞ্জনকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেন। ইরানি গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছিল, চুক্তির অংশ হিসেবে ইরান ও ওমান যৌথভাবে হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করবে। ট্রাম্প অত্যন্ত কড়া ভাষায় তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, “এই আন্তর্জাতিক নৌপথ কারো একক নিয়ন্ত্রণে থাকবে না, এটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।”
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই অনমনীয় মনোভাব এবং বন্দর আব্বাসে মার্কিন হামলার পর ইরানের এই সরাসরি পাল্টা আঘাত ওমানে চলমান শান্তি প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ভেস্তে দিতে পারে, যা বিশ্বকে এক অনির্দিষ্ট মহাযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
