ট্রাম্পের ‘শুল্কবোমা’র জবাবে অটওয়ার কড়া আঘাত: ২০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন পণ্যে সর্বোচ্চ ৫০% পাল্টা শুল্ক কানাডার

0
ট্রাম্পের ‘শুল্কবোমা’র জবাবে অটওয়ার কড়া আঘাত: ২০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন পণ্যে সর্বোচ্চ ৫০% পাল্টা শুল্ক কানাডার

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যযুদ্ধ নতুন করে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। উত্তর আমেরিকার প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যবর্তী দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কে নজিরবিহীন চিড় ধরিয়ে মার্কিন পণ্যের ওপর বড় ধরনের পাল্টা আঘাত হানল অটোয়া। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বিতর্কিত শুল্ক নীতির জবাবে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের মার্কিন আমদানিকৃত পণ্যে বিপুল শুল্ক আরোপের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে কানাডা সরকার।

রয়টার্স জানিয়েছে, অটোয়ার এই নতুন নির্দেশনার অধীনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা প্রায় ৭০০টি ভিন্ন ভিন্ন ক্যাটাগরির পণ্যের ওপর সর্বনিম্নে ১৫ শতাংশ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক কার্যকর হবে। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে এই উচ্চ হার কার্যকর হতে যাচ্ছে।

দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের মধ্যস্থতা ও উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর গত শনিবার (২৩ আগস্ট) কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হওয়া ২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যে ৫০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক বসান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্পের এই আগ্রাসী পদক্ষেপকে অর্থনৈতিক ব্ল্যাকমেইল উল্লেখ করে তাৎক্ষণিক ও কঠোর প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থার রূপরেখা তৈরি করে কানাডীয় অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

মার্কিন অর্থনীতিকে আঘাত করতে পণ্যের ধরণ ও শুল্কের হার নির্ধারণে বিশেষ কৌশল নিয়েছে কানাডা:

৫০% সর্বোচ্চ শুল্ক: ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, আসবাবপত্র ও তৈরি পোশাক সামগ্রী।

২৫% মাঝারি শুল্ক: প্রক্রিয়াজাত পনির, গৃহস্থালি সিরামিক/ইলেকট্রিক সরঞ্জাম এবং নির্ধারিত সামুদ্রিক খাবার।

১৫% প্রাথমিক শুল্ক: হাই-টেক ইলেকট্রনিকস, ইন্ডাস্ট্রিয়াল যন্ত্রপাতি ও ভারী বৈচিত্র্যময় সরঞ্জাম।

অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত খাত: প্রক্রিয়াজাত খাদ্যসামগ্রী, বিলাসবহুল সুগন্ধি, প্রসাধন ও পার্সোনাল কেয়ার পণ্য, প্লাস্টিক, প্রক্রিয়াজাত কাঠ, কাগজ, কার্পেট, রেল ইঞ্জিন, মোটরসাইকেল এবং গেমিং গিয়ার।

অটোয়ার এই পাল্টা পদক্ষেপ কেবলই একটি অর্থনৈতিক প্রতিরোধ নয়, বরং এর পেছনে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক কৌশল রয়েছে। কানাডার শিল্পমন্ত্রী মেলানি জোলি এক সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট জানান, কানাডীয় ব্যবসা ও শিল্পের সুরক্ষার পাশাপাশি মার্কিন প্রশাসনের ওপর কৌশলগত রাজনৈতিক চাপ তৈরি করাই তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য।

আগামী ৩ নভেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। কানাডা মূলত মার্কিন রিপাবলিকান সমর্থিত এবং ট্রাম্পের ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত মূল অঙ্গরাজ্যগুলোর (Swing States) উৎপাদিত পণ্যকেই শুল্কের জন্য নিশানা করেছে। জোলির মতে, কৃষি, টেক্সটাইল ও ভারী উৎপাদনকারী অঙ্গরাজ্যগুলোর অর্থনীতিতে ধস নামলে ট্রাম্পের ওপর নিজস্ব দলের ভেতর থেকেই ট্রানজিট ব্যাকল্যাশ বা চাপ সৃষ্টি হবে।

শুল্কযুদ্ধের কারণে দেশীয় অর্থনীতির সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় শুধু প্রতিরক্ষামূলক শুল্ক নয়, একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক সুরক্ষা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে কানাডা সরকার:

শুল্কজনিত অচলাবস্থায় ঝুঁকিতে পড়া কারখানা, প্রতিষ্ঠান এবং চাকরি হারানোর শঙ্কায় থাকা শ্রমিকদের পুনর্বাসনে সাড়ে ৭ বিলিয়ন কানাডীয় ডলারের রেকর্ড আর্থিক সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে।

কানাডার রাষ্ট্রীয় ঋণদাতা সংস্থা *বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক অব কানাডা (BDC)* ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (SMEs) ২৫ লাখ থেকে ৫০ লাখ কানাডীয় ডলার পর্যন্ত সরাসরি সুদমুক্ত ঋণ দেবে।

ব্যবসায়ীদের ঘুরে দাঁড়ানোর পর্যাপ্ত সুযোগ দিতে ঋণের কিস্তি বা মূল অর্থ পরিশোধ শুরু করার জন্য দীর্ঘ ৩৬ মাসের (৩ বছর) গ্রেড পিরিয়ড দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তর আমেরিকান মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (USMCA) পর এটিই দুই বন্ধুপ্রতীম দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক সংঘাত। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর শুল্ক কার্যকর হলে উত্তর আমেরিকার সরবরাহ শৃঙ্খলে (Supply Chain) বড় ধরনের মন্দা দেখা দিতে পারে।