
কূটনৈতিক প্রতিবেদকঃ কূটনৈতিক দূরদর্শিতা ও ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের এক উজ্জ্বল নিদর্শন তৈরি করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নজর কাড়ল বাংলাদেশ-ভুটান সম্পর্ক। সিঙ্গাপুর থেকে দেশে ফেরার পথে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতিকালে ভুটানের চতুর্থ মেয়াদী দূরদর্শী রাজা জিগমে খেসার নামগে ওয়াংচুকের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হয়েছেন সদ্য দায়িত্ব গ্রহণ করা বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
বুধবার ভোরে বিমানবন্দরে অনুষ্ঠিত এই ১ ঘণ্টার বিরল ও নৈশ ভিভিআইপি বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, শিক্ষা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক সংযোগের প্রসারে একটি যুগান্তকারী রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করা হয়।
ভুটানের রাজাকে বহনকারী বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটটি বুধবার ভোরের আলো ফোটার আগে ঢাকা স্পর্শ করে। শাহজালাল বিমানবন্দরের ভিভিআইপি লাউঞ্জে পৌঁছালে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভুটানি রাজাকে ফুলের শুভেচ্ছা ও উষ্ণ স্বাগত জানান।
সাক্ষাতের শুরুতেই ভুটানের রাজা জিগমে খেসার নামগে ওয়াংচুক রাষ্ট্রপতির পদে দায়িত্ব গ্রহণ করায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান এবং তার মেয়াদের সাফল্য কামনা করেন। প্রত্যুত্তরে রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষের পক্ষ থেকে ভুটানের রাজপরিবার ও দেশটির জনগণের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেন।
আলাপকালে বাংলাদেশ ও ভুটানের মধ্যকার অভিন্ন ঐতিহাসিক ও আবেগের সম্পর্কের কথা স্মরণ করেন রাষ্ট্রপ্রধান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি উল্লেখ করেন, “ভুটান আমাদের হৃদয়ে এক চিরন্তন ও বিশেষ স্থানে অবস্থান করছে। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে স্বাধীন বাংলাদেশকে সর্বপ্রথম অর্থনৈতিক ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছিল ভুটান।”
একইসঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও পরবর্তী পুনর্গঠনে বর্তমান রাজার পিতা—ভুটানের সাবেক চতুর্থ রাজা জিগমে সিংগে ওয়াংচুকের বিশেষ মমতা ও শুভকামনার কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি।
বৈঠকের অন্যতম প্রধান আলোকপাত ছিল ভুটানের রাজা ঘোষিত তার স্বপ্নের ‘গেলেফু মাইন্ডফুলনেস সিটি’ (Gelephu Mindfulness City) মেগা প্রজেক্ট। দক্ষিণ এশিয়ার নতুন অর্থনৈতিক ও পরিবেশবান্ধব হাব হিসেবে গড়ে তোলা এই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বাংলাদেশ থেকে যৌথ বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত বিনিময় এবং মানবসম্পদ বিকাশের বিষয়ে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করেন রাজা জিগমে খেসার নামগে ওয়াংচুক।
রাষ্ট্রপতি প্রজেক্টটির ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং জানান যে, দক্ষিণ এশিয়ার সমৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে ভুটানের এই রূপান্তরমূলক পদক্ষেপে ঘনিষ্ঠ অংশীদার হয়ে কাজ করতে শতভাগ প্রস্তুত বাংলাদেশ।
বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গতি ত্বরান্বিত করতে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বকে সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়। রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল রাজপরিবারসহ ভুটানের রাজাকে বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় সফরের সুবিধাজনক সময়ে আসার আমন্ত্রণ জানান।
এর জবাবে ভুটানের রাজা আনন্দ প্রকাশ করে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও দেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিকট সুবিধাজনক সময়ে থিম্পু সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান।
এই গুরুত্বপূর্ণ সৌজন্য সাক্ষাতকালে উপস্থিত ছিলেন ড. খলিলুর রহমান (পররাষ্ট্রমন্ত্রী, বাংলাদেশ সরকার)। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভুটানের মান্যবর রাষ্ট্রদূত। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ।
আন্তরিক ও সোহার্দ্যপূর্ণ আলোচনা শেষে সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে ভুটানের রাজাকে বহনকারী বিশেষ ফ্লাইটটি ভুটানের রাজধানী থিম্পুর উদ্দেশ্যে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করে।
