মার্কিন আগ্রাসনে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও হামলার ছক তেহরানের: পেজেশকিয়ানের কঠোর হুঁশিয়ারি, অচলাবস্থায় কূটনীতি

0
মার্কিন আগ্রাসনে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও হামলার ছক তেহরানের: পেজেশকিয়ানের কঠোর হুঁশিয়ারি, অচলাবস্থায় কূটনীতি

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো নতুন সামরিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন ও কঠোর জবাব দেওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। কূটনৈতিক প্রচেষ্টার দরজা আনুষ্ঠানিকভাবে খোলা রাখা হলেও বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে তা সফল হওয়ার আশা প্রায় নেই বললেই চলে—এমনটিই মনে করছেন দেশটির নীতিনির্ধারক ও সামরিক বিশ্লেষকরা।

ইরানের উচ্চপর্যায়ের তিনজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, শীর্ষ সামরিক কমান্ডাররা একটি বিস্তৃত রণকৌশল পর্যালোচনা করছেন। এই কৌশল অনুযায়ী, নতুন করে মার্কিন হামলা হলে কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের ভৌগোলিক অঞ্চলে থাকা মার্কিন সম্পদ এবং মার্কিন সামরিক অভিযানে সহায়তাকারী মিত্র দেশগুলোতেও সরাসরি লক্ষ্যবস্তু বিস্তৃত করা হবে। বিশেষ করে গত সপ্তাহে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিয়ে নিউইয়র্ক থেকে ফেরার পর এই সামরিক প্রস্তুতি বহুগুণ জোরদার করা হয়েছে।

পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ ইরান বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজি বলেন, “তেহরান আর কেবল কোনো প্রতীকী পদক্ষেপে সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রতীকী হামলার জবাবে এখন থেকে তারা পুরোদমে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সংঘাত আরও বাড়িয়ে দেবে।”

ইতোমধ্যে তেহরান লেবানন, ইয়েমেন ও ইরাকে অবস্থানরত তাদের মিত্র সামরিক গোষ্ঠীগুলোকে (অক্ষশক্তির সদস্য) সর্বোচ্চ সতর্কতায় থাকার নির্দেশ দিয়েছে। নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ থেকে শুরু করে পুরো অঞ্চল ও তার বাইরে একযোগে সমন্বিত জবাব দেওয়া হতে পারে।

একদিকে সামরিক তৎপরতা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে সাত দিনের একটি যুদ্ধবিরতির শর্তযুক্ত প্রস্তাব দিয়েছিল তেহরান। এতে মূল শর্ত ছিল—সামুদ্রিক বন্দর অবরোধ প্রত্যাহার, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে থাকা ইরানের ১২ বিলিয়ন ডলারের জব্দ করা সম্পদ অবমুক্তকরণ এবং তেল বিক্রির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া।

যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রাথমিকভাবে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, তবুও কাতারি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি পরোক্ষ বার্তা তেহরানে পৌঁছেছে। তবে এতে ওয়াশিংটন মূল আলোচনার সাথে ‘পারমাণবিক ইস্যু’ পুনরায় যুক্ত করতে চেয়েছে, যা বর্তমান কোনো শর্ত পূরণ ছাড়া মানতে নারাজ ইরান। এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, পরোক্ষ আলোচনা সাময়িকভাবে চললেও দুই পক্ষের অবস্থান এতটা বিপরীতমুখী যে এখন কোনো স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানো অসম্ভব।

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইরান প্রোগ্রামের পরিচালক অ্যালেক্স ভাতানকা উল্লেখ করেছেন, “মার্কিন দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অবরুদ্ধ পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠা তেহরানের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। যা সরাসরি বর্তমান সরকারের অস্তিত্বের ওপর আঘাত হানছে। ফলে পিঠ দেওয়ালে ঠেকে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও অনাকাঙ্ক্ষিত ও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কাই প্রবল।”

গত সাত মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই সংকটে একদিকে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়েছে, অন্যদিকে সামরিক চাপ ও কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি চরম বিপর্যয়ে পড়েছে। দেশটির সাবেক এক সংস্কারপন্থি কর্মকর্তা শঙ্কা প্রকাশ করে জানান, অর্থনৈতিক এই টানাপোড়েনে দেশে আবারও জানুয়ারি মাসের মতো ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দানা বাঁধতে পারে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, চলমান যুদ্ধের মধ্যে দেশটিতে অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়ন কঠোর করা হয়েছে এবং মে মাসের পর থেকে এ পর্যন্ত ৬ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

একদিকে সামরিক মহড়া ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ (IRNA) জানায়, বৃহস্পতিবার (০১ অক্টোবর) দেশের উদ্যোক্তা ও অর্থনৈতিক খাতের শীর্ষ ব্যক্তিদের সাথে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তিনি এই বক্তব্য দেন।

পেজেশকিয়ান সাফ জানিয়ে দেন, “ইরানকে নতজানু করার চিন্তা যুক্তরাষ্ট্রকে চিরতরে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে হবে। আমরা সর্বদা আমাদের মর্যাদা ও জাতীয় বীরত্বের সাথে সমাজ ও জনগণের অধিকার রক্ষা করব।”

তিনি আরও যোগ করেন, “ইরান কখনোই কূটনৈতিক আলোচনা থেকে পালিয়ে যায়নি এবং ভবিষ্যতেও যাবে না। তবে ইতিহাস সাক্ষী, যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি স্বাক্ষর করার পরও তিন-তিনবার আমাদের ভূখণ্ডে হামলা চালিয়েছে।”

এখানে উল্লেখ্য, ‘চুক্তি’ বলতে পেজেশকিয়ান মূলত গত জুনের মাঝামাঝি সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকের কথা নির্দেশ করেছেন। ওই সমঝোতার মাধ্যমে তৎকালীন যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে তা ভেঙে পড়ে। তেহরানের অভিযোগ ছিল, চুক্তি করলেও ওয়াশিংটন সামুদ্রিক নৌ-অবরোধ বহাল রেখে শর্ত চরমভাবে লঙ্ঘন করেছিল।

প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান শত্রুপক্ষের প্রতি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “শত্রুরা ভেবেছিল আমাদের সর্বোচ্চ নেতার শাহাদাতের পর দেশের জনগণ, সামরিক কমান্ডার ও পরমাণু বিজ্ঞানীরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়বেন। কিন্তু বাস্তবচিত্র ভিন্ন; এতে আমাদের জাতীয় ঐক্য, অভ্যন্তরীণ সংহতি এবং প্রতিরোধের শক্তি আগের চেয়ে অনেক বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সন্ত্রাস আর শাহাদাতের ভয় দেখিয়ে আমাদের থামানো যাবে না। সূত্র: সিবিএস নিউজ ও রয়টার্স অবলম্বনে