আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ও অত্যন্ত জনপ্রিয় দুর্গাপূজার মণ্ডপে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়ের মধ্যে ভয়াবহ পদদলনের ঘটনা ঘটেছে। সপ্তমী সন্ধ্যার এই আনন্দের উৎসব মুহূর্তেই এক মর্মান্তিক শোকে পরিণত হয়। উত্তর কলকাতার ব্যস্ত এলাকার চোরবাগান সর্বজনীন পূজামণ্ডপে দেবদর্শনে আসা হাজারো মানুষের ঢল সামাল দিতে গিয়ে এই বিপর্যয় ঘটে। এতে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৭ জন দর্শনার্থী নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে এবং শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। আহতদের অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সপ্তমীর সন্ধ্যায় আনুমানিক ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হয়। বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে এবং মণ্ডপ ছেড়ে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য দর্শনার্থীরা একসাথে হুড়োহুড়ি শুরু করেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, গিরিশ পার্ক থানার অধীন সারদা পার্ক বা চোরবাগান সর্বজনীন পূজামণ্ডপের প্রবেশপথ এবং বিশেষ করে বহির্গমন (Exit) ফটক অত্যন্ত সংকীর্ণ ছিল। এছাড়া ওই অংশে পর্যাপ্ত আলোর অভাব থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। সংকীর্ণ ফটক এবং বৃষ্টির কারণে তৈরি হওয়া বিশৃঙ্খলার মধ্যে শত শত মানুষ আটকা পড়েন। অনেকে পদদলিত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং ভিড়ের চাপে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
দুর্ঘটনার তীব্রতা টের পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে। খবর পাওয়া মাত্রই কলকাতা পুলিশ কন্ট্রোল রুম, দমকল বাহিনী, দুর্যোগ মোকাবিলা দল (ডিএমজি), একাধিক চিকিৎসক দল এবং পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করে।
আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে শহরের অন্যতম প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (এমসিএইচ) নিয়ে যাওয়া হয়। পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক পর্যায়ে অন্তত ৩৫ জনের বেশি গুরুতর আহতকে সরাসরি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছিল।
অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে এবং তদন্তের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট পূজামণ্ডপটি তৎক্ষণাৎ দর্শনার্থীদের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় রাজ্যজুড়ে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং প্রশাসনিক শীর্ষ কর্তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় হয়েছেন। পরিস্থিতি সরাসরি পর্যালোচনা করতে এবং চিকিৎসাসেবা তদারকি করতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী এবং মুখ্য সচিব মনোজ আগরওয়াল দ্রুত কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটে যান।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শোকবার্তা: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক শোকবার্তায় পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গভীর বেদনা প্রকাশ করে লেখেন—
“চোরবাগান পূজামণ্ডপে পদদলনের ঘটনায় আমি গভীরভাবে মর্মাহত ও দুঃখিত। আমি মা দুর্গার কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আহত সবাইকে দ্রুত সুস্থ করে তোলেন এবং এই কঠিন সময়ে তাদের পরিবারকে শক্তি ও সাহস দেন।”
সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ থেকে দুর্গম পরিস্থিতির আরও ভয়ংকর চিত্র সামনে এসেছে। এএনআই-এর কাছে এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, পদদলনের সময় অনেকেই হুড়োহুড়িতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। সংকটে পড়া এসব মানুষকে দ্রুত উদ্ধার করে অনেক সময় স্থানীয়রা মোটরসাইকেলে করেও হাসপাতালে পৌঁছে দেন।
আরেক প্রত্যক্ষদর্শী আক্ষেপ করে জানান, মণ্ডপটির নকশাগত ত্রুটির কারণে বের হওয়ার পথ এতই সরু ছিল যে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি আগেই তৈরি হয়েছিল, যার ওপর পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থাও ছিল না। বর্তমানে তার পরিবারের সদস্যও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

