
বাংলাদেশ প্রতিবেদক: বিগত ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংঘটিত নজিরবিহীন জালিয়াতি ও প্রশাসনিক অনিয়মের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দিয়েছে তদন্ত কমিশন। সোমবার (১২ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এই প্রতিবেদন হস্তান্তর করা হয়।
প্রতিবেদন গ্রহণকালে প্রধান উপদেষ্টা একে জাতির ওপর চালানো একটি ‘শাস্তি’ হিসেবে অভিহিত করেন এবং ভবিষ্যতে যেন আর কখনও এমন ‘ভোট ডাকাতি’ না ঘটে, সে বিষয়ে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন।
বিচারপতি শামীম হাসনাইনের নেতৃত্বাধীন তদন্ত কমিশন তাদের প্রতিবেদনে তিনটি নির্বাচনের ভিন্ন ভিন্ন কৌশল ও অনিয়ম বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছে:
২০১৪ (বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার ব্লু-প্রিন্ট): ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং বাকি ১৪৭টিতে লোকদেখানো নির্বাচন ছিল সম্পূর্ণ সাজানো। আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে এটি ছিল রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একটি সুপরিকল্পিত বন্দোবস্ত।
২০১৮ (রাতের ভোটের উৎসব): কমিশনের প্রাক্কলন অনুযায়ী, দেশের ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে রাতের বেলায় ব্যালট পেপারে সিল মেরে রাখা হয়েছিল। এমনকি কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোট প্রদানের হার ১০০ শতাংশও ছাড়িয়ে যায়। প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীর এক শ্রেণির কর্মকর্তার মধ্যে আওয়ামী লীগকে জেতানোর জন্য ‘অসৎ প্রতিদ্বন্দ্বিতা’ লক্ষ্য করা গেছে।
২০২৪ (ডামি নির্বাচনের প্রহসন): বিরোধী দলগুলো নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় ভোটারদের কেন্দ্রে টানতে ‘ডামি প্রার্থী’র অভিনব অপকৌশল গ্রহণ করা হয়। মূলত নির্বাচন কমিশনকে ঠুঁটো জগন্নাথ বানিয়ে প্রশাসনই হয়ে উঠেছিল নির্বাচনের মূল চালিকাশক্তি।
প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিজের প্রতিক্রিয়ায় ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “আমরা ভোট ডাকাতির কথা জানতাম, কিন্তু পুরো প্রক্রিয়াকে এত নির্লজ্জভাবে বিকৃত করা হয়েছে যে সিস্টেমকে দুমড়ে-মুচড়ে ফেলে নিজেদের মনের মতো রায় লিখে নেওয়া হয়েছে। দেশের টাকা খরচ করে পুরো জাতিকেই শাস্তি দেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “জনগণের স্বস্তির জন্য এবং ইতিহাসের প্রয়োজনে যারা এই জঘন্য কাজের সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের চেহারাগুলো সামনে আসা দরকার। কারা করল, কীভাবে করল—তা রেকর্ড থাকা উচিত যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন দুঃসাহস না দেখায়।”
প্রতিবেদন পেশ করার সময় কমিশন প্রধান বিচারপতি শামীম হাসনাইন ছাড়াও সদস্য শামীম আল মামুন, কাজী মাহফুজুল হক সুপণ, ব্যারিস্টার তাজরিয়ান আকরাম হোসেন এবং ড. মো. আব্দুল আলীম উপস্থিত ছিলেন। সরকারের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, তথ্য উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান এবং সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী।
কমিশন জানায়, এই ১০ বছরে নির্বাচন ব্যবস্থাকে নির্বাচন কমিশনের হাত থেকে কার্যত প্রশাসনের পকেটে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। একটি বিশেষ ‘নির্বাচন সেল’ গঠনের মাধ্যমে এই পুরো জালিয়াতি পরিচালনা করা হতো।
