আদানি চুক্তি বাতিল নাকি সংশোধন? অন্তর্বর্তী সরকারের ‘বিস্ফোরক’ রিপোর্ট এখন নির্বাচিত সরকারের টেবিলে

0
আদানি চুক্তি বাতিল নাকি সংশোধন? অন্তর্বর্তী সরকারের ‘বিস্ফোরক’ রিপোর্ট এখন নির্বাচিত সরকারের টেবিলে

বিশেষ প্রতিবেদকঃ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদ্যুৎ খাতের তথাকথিত ‘অন্ধকার’ অধ্যায় উন্মোচনে বড় পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে বর্তমান নির্বাচিত সরকার। বিশেষ করে ভারতের আদানি পাওয়ারের সাথে করা বিতর্কিত বিদ্যুৎ চুক্তি বাতিল বা আইনি লড়াইয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া পর্যালোচনা কমিটির রিপোর্টটি এখন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে।

গতকাল সচিবালয়ে বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই সংবেদনশীল বিষয়ে নীতিগত আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে।

সচিবালয়ে আয়োজিত এই বিশেষ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এবং বিদ্যুৎ সচিবসহ রাষ্ট্রের শীর্ষ নীতিনির্ধারকরা। বৈঠকের মূল এজেন্ডা ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত ৫ সদস্যের জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির জমা দেওয়া প্রতিবেদন।

বৈঠক শেষে বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন:”আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের রিপোর্টটি বিস্তারিত পর্যালোচনা করছি। আন্তর্জাতিক চুক্তির ক্ষেত্রে অনেক আইনি মারপ্যাঁচ থাকে, চাইলেই হুট করে বাতিল করা যায় না। তবে পরিষ্কার কথা হলো—দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো কিছু আমরা মেনে নেব না।”

একই সুরে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, প্রতিটি চুক্তি এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে এবং দেশের লাভ-ক্ষতির হিসাব কষে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর গঠিত এই উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি দীর্ঘ দেড় বছর অনুসন্ধান চালিয়ে আদানির চুক্তিতে ভয়াবহ সব অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে। কমিটির সদস্য অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান বৈঠকের পর গণমাধ্যমকে বলেন, “আমি আনন্দিত যে আমাদের সুপারিশগুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। আমরা এমন সব তথ্য-প্রমাণ পেয়েছি যা আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা জেতার জন্য যথেষ্ট।”

কমিটির রিপোর্টের উল্লেখযোগ্য দিকসমূহ: চুক্তির নেপথ্যে ৭-৮ জন ব্যক্তির কয়েক মিলিয়ন ডলারের অবৈধ লেনদেনের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। দুর্নীতির এই তথ্য ও সংশ্লিষ্টদের ট্রাভেল ডকুমেন্ট অধিকতর তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানো হয়েছে। কমিটি মনে করছে, আদানির সাথে চুক্তি বাতিলের জন্য সিঙ্গাপুরের সালিশি আদালতে যাওয়ার মতো শক্তিশালী অবস্থান বাংলাদেশের রয়েছে।

এদিকে আদানি পাওয়ার এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, পর্যালোচনা কমিটির প্রতিবেদন নিয়ে তাদের সাথে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ করা হয়নি।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আদানির চুক্তিতে ক্যাপাসিটি চার্জ, শুল্ক ফাঁকি এবং একপেশে শর্তের কারণে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে বর্তমান সরকার তড়িঘড়ি করে কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে আইনি পথগুলো যাচাই করছে, যাতে আন্তর্জাতিক আদালতে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল না হয়।

পর্যালোচনা কমিটির প্রধান সাবেক বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী আগেই সতর্ক করেছিলেন যে, সিদ্ধান্তে বিলম্ব করলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের দাবি জোরালো করা কঠিন হতে পারে। ২০ জানুয়ারি জমা দেওয়া এই চূড়ান্ত প্রতিবেদন এখন নতুন সরকারের জন্য বড় একটি পরীক্ষা।

জনগণ প্রত্যাশা করছে, বিদ্যুৎ খাতের দায়মুক্তি আইনের আড়ালে হওয়া এই ‘লুণ্ঠন’ বন্ধে সরকার সাহসী কোনো পদক্ষেপ নেবে।