দেড়যুগ পর প্যারেড গ্রাউন্ডে আকাশ-মাটি কাঁপানো কুচকাওয়াজ, সালাম নিলেন রাষ্ট্রপতি

0
দেড়যুগ পর প্যারেড গ্রাউন্ডে আকাশ-মাটি কাঁপানো কুচকাওয়াজ, সালাম নিলেন রাষ্ট্রপতি

বাংলাদেশ প্রতিবেদকঃ দীর্ঘ ১৮ বছরের স্থবিরতা ভেঙে রাজধানীর আকাশ ও মাটিতে আছড়ে পড়ল শৌর্য-বীর্যের গর্জন। ২০০৮ সালের পর এই প্রথম মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে অনুষ্ঠিত হলো সশস্ত্র বাহিনীর সেই ঐতিহাসিক কুচকাওয়াজ। চব্বিশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের উদ্যোগে আয়োজিত এই প্যারেড দেশপ্রেম ও সামরিক সক্ষমতার এক অনন্য মেলবন্ধনে রূপ নিয়েছে।

২০০৮ সালের পর ২৬ মার্চের কুচকাওয়াজ বন্ধ ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও এই আয়োজন দেখা যায়নি। তবে ২০২৬ সালের রোজার শুরু থেকেই সাভারের নবম পদাতিক ডিভিশনের ব্যবস্থাপনায় এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের তত্ত্বাবধানে তেজগাঁও পুরাতন বিমানবন্দরে শুরু হয় ব্যাপক প্রস্তুতি। গত মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) অনুষ্ঠিত ‘ফুল ড্রেস রিহার্সাল’-এর মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হয় আজকের এই মূল আয়োজন।

বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কথা থাকলেও উৎসবের আমেজ শুরু হয় অনেক আগে থেকেই। রাজকীয় ভঙ্গিতে ঘোড়ায় চড়ে মঞ্চের সামনে আসেন প্যারেড অধিনায়ক ও নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল এস এম আসাদুল হক। তিনি উপ-অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাফকাতুল ইসলামের কাছ থেকে দায়িত্ব বুঝে নিয়ে জাতীয় পতাকাবাহী দলকে মাঠে আমন্ত্রণ জানান। এরপর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে সশস্ত্র সালাম প্রদানের মাধ্যমে শুরু হয় মূল কুচকাওয়াজ।

ছন্দবদ্ধ পা আর মুষ্টিবদ্ধ হাতের প্রত্যয়ী শপথে একে একে মঞ্চ অতিক্রম করে বিভিন্ন কন্টিনজেন্ট। কুচকাওয়াজে অংশগ্রহণ করে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট (PGR), ইস্ট বেঙ্গল, ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্ট, আর্টিলারি ও সিগন্যাল কন্টিনজেন্ট। নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, পুলিশ, আনসার-ভিডিপি এবং বিএনসিসি। প্রথমবারের মতো সম্মিলিত নারী কন্টিনজেন্ট ও মডার্নাইজড ইনফ্যান্ট্রি কন্টিনজেন্টের কুচকাওয়াজ দর্শকদের মুগ্ধ করে।

প্যারেডের অন্যতম রোমাঞ্চকর মুহূর্ত ছিল প্যারাট্রুপারদের অবতরণ। ১০ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে ২৬ জন প্যারাট্রুপার জাতীয় ও বিভিন্ন বাহিনীর পতাকা নিয়ে নিখুঁতভাবে প্যারেড গ্রাউন্ডে অবতরণ করেন। এর পরপরই শুরু হয় বিমানবাহিনীর ‘অ্যারোবেটিক শো’। ‘বাংলার আকাশ রাখিব মুক্ত’ প্রতিপাদ্যে পাঁচটি এফ-সেভেন যুদ্ধবিমান বর্ণিল ধোঁয়া উড়িয়ে আকাশে রঙধনু সৃষ্টি করে। সবশেষে মিগ-২৯ যুদ্ধবিমানের ‘ভিক্টোরি রোল’ প্রদর্শনী দর্শকদের আসন ছেড়ে দাঁড়াতে বাধ্য করে।

মাঠজুড়ে একে একে এগিয়ে আসে বিভিন্ন বাহিনীর যান্ত্রিক বহর। ট্যাংক, দূরপাল্লার কামান এবং অত্যাধুনিক রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার প্রদর্শনী বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার এক শক্তিশালী বার্তা দেয়। এছাড়া ডগ স্কোয়াড ও অশ্বারোহী দলের পাশাপাশি খোলা জিপে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অভিবাদন গ্রহণ ছিল অত্যন্ত আবেগঘন।

অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন কুচকাওয়াজের সালাম গ্রহণ করেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং তাঁর কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান।

অনুষ্ঠানের সমাপনী ছিল আরও স্মৃতিমধুর। বিভিন্ন বাহিনীর ৭২৫ জন সদস্যের বিশাল বাদক দল যখন মার্চপাস্ট করে মাঠ ত্যাগ করছিল, তখন তাদের বাদ্যযন্ত্রে বেজে ওঠে কালজয়ী গান—‘প্রথম বাংলাদেশ আমার, শেষ বাংলাদেশ’ এবং ‘জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো’।

দীর্ঘ ১৮ বছর পর ফিরে আসা এই আয়োজন দেখতে প্যারেড গ্রাউন্ডে হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে। শিশু-কিশোরদের হাতে ও মাথায় জড়ানো ছিল লাল-সবুজের পতাকা। আগত দর্শকদের মতে, এই কুচকাওয়াজ কেবল সামরিক শক্তি প্রদর্শন নয়, বরং এটি সার্বভৌমত্বের প্রতীক এবং জাতীয় ঐক্যের এক নতুন দলিল।