স্বপন কুমার কুন্ডুঃ বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও প্রযুক্তির ইতিহাসে আজ এক সোনালী দিন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে পাবনার ঈশ্বরদীতে অবস্থিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম দেশ হিসেবে পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারকারী ক্লাবে নিজের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করল।
আজ মঙ্গলবার বিকেলে এক জমকালো অনুষ্ঠানে এই ঐতিহাসিক কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। এছাড়া রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি সংস্থা ‘রোসাটম’-এর মহাপরিচালক আলেক্সেই লিখাচেভ এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) মহাপরিচালক রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি (ভিডিও বার্তায়) উপস্থিত থেকে এই অর্জনকে অভিনন্দন জানান।
জ্বালানি লোডিং শুরুর মাধ্যমে প্রকল্পটি এখন নির্মাণের ধাপ পেরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত প্রস্তুতিতে প্রবেশ করল। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো হলো:
সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী জুলাই বা আগস্টের শেষ নাগাদ পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে। ২০২৬ সালের শেষ বা ২০২৭ সালের শুরুর দিকে প্রথম ইউনিট থেকে পূর্ণমাত্রায় (১২০০ মেগাওয়াট) বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। প্রকল্পের দুটি ইউনিট পূর্ণ চালু হলে মোট ২৪০০ মেগাওয়াট পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ মিলবে, যা দেশের মোট চাহিদার ১০ শতাংশের বেশি মেটাবে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটির আয়ুষ্কাল ধরা হয়েছে প্রায় ১০০ বছর।
“মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আমরা আজ এই অবস্থানে পৌঁছেছি। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে রাশিয়ার অবদান এবং বর্তমানের এই কারিগরি সহযোগিতা দুই দেশের বন্ধুত্বকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এটি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে নেওয়া পারমাণবিক অগ্রযাত্রার স্বপ্নের এক সফল বাস্তবায়ন।” — ফকির মাহবুব আনাম, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী।
ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, “রূপপুর প্রকল্প শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, এটি আমাদের দেশীয় সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার এক উজ্জ্বল প্রতিফলন। এটি জ্ঞানভিত্তিক ও আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতির দিকে আমাদের এক বিশাল ধাপ।”
প্রকল্পের নিরাপত্তা বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাশিয়ার রোসাটম প্রধান জানান আইএইএ (IAEA)-এর কঠোর নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করে এখানে ভিভিইআর-১২০০ রিয়্যাক্টর ব্যবহার করা হয়েছে। ইতোমধ্যেই ৯০০-এর বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী রাশিয়ায় উচ্চশিক্ষা শেষ করে প্রকল্পে যুক্ত হয়েছেন। ভবিষ্যতে এই সংখ্যা ১১০০ ছাড়িয়ে যাবে। তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় রাশিয়ার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী নিরাপদ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।
১৯৬১ সালে প্রথম প্রস্তাবিত হওয়া এই প্রকল্পের স্বপ্ন আজ বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কেবল বিদ্যুতের ঘাটতিই মেটাবে না, বরং এটি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ‘ক্লিন এনার্জি’র এক নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে বাংলাদেশের শিল্পায়নকে ত্বরান্বিত করবে।

