বাংলাদেশ প্রতিবেদকঃ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস-২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভা ও আলোকচিত্র প্রদর্শনী ঘিরে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, ইসলামী ছাত্রশিবির এবং জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতা-কর্মীদের মধ্যে নজিরবিহীন দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জকসু) ভিপি, জিএস, এজিএস ও অন্তত ৫ জন পেশাগত দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকসহ ৭০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন।
সংঘাত শুধু ক্যাম্পাসেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টার এবং পরবর্তীতে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে কয়েক দফায় তাণ্ডব চালানো হয়, যার ফলে সাধারণ রোগী ও চিকিৎসকদের মাঝে তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদের উপস্থিতিতে স্মারক অনুষ্ঠান চলাকালে জকসু ও ইনকিলাব মঞ্চের প্রতিনিধিরা প্রবেশ করতে চান। তাদের হাতে দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ দ্রুত সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর, অস্থায়ী আবাসনের কাজ দ্রুত শুরু এবং চিকিৎসা সেবার উন্নয়নের মতো সাধারণ শিক্ষার্থীদের মূল দাবি সংবলিত প্ল্যাকার্ড ছিল।
অডিটোরিয়ামে প্রবেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা তাদের বাধা দিলে প্রথমে কথা-কাটাকাটি ও ধাক্কাধাক্কি হয়। অডিটোরিয়ামের সামনে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করলে সেখানে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের সাথে তর্কযুদ্ধ থেকে একপর্যায়ে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং রড, লাঠিসোঁটা নিয়ে সংঘাত শুরু হয়।
প্রথম দফায় আহতরা ক্যাম্পাসের মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসা নিতে গেলে সেখানে হামলা চালানো হয় এবং আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, জকসুর ভিপি রিয়াজুল ইসলাম ও জিএস আব্দুল আলিম আরিফকে সেখানে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।
দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জবি, কবি নজরুল কলেজ ও সোহরাওয়ার্দী কলেজ ছাত্রদল এবং স্থানীয় যুবদলের নেতা-কর্মীরা পার্শ্ববর্তী ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল হাসপাতালে কয়েক দফায় হামলা চালায়। সেখানে চিকিৎসাধীন শিবির কর্মী, সাধারণ রোগী ও স্বজনদের ওপর হামলা চালানো হয় এবং হাসপাতালের জরুরি বিভাগ অবরুদ্ধ করে রাখা হয়।
ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগ সূত্র জানায়, বিকেল পর্যন্ত প্রায় ৭০ জনের অধিক আহত শিক্ষার্থী ও সদস্য হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন।
দায়িত্ব পালনকালে আহত সাংবাদিক সোহায়েল আহমেদ (বাংলা ট্রিবিউন) কায়েস মাহমুদ (আজকালের খবর) আব্দুল্লাহ আল মামুন (আমার সংবাদ) রজব আল ফাহিম (ঢাকা স্ট্রিম) মোহন খন্দকার (প্রাইম বাংলাদেশ)
সংবাদ সম্মেলনে জকসুর ভিপি রিয়াজুল ইসলাম দাবি করেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০ কোটি টাকার অস্থায়ী হল নির্মাণের টেন্ডার একটি বিশেষ ছাত্রসংগঠনের হাতে তুলে দেওয়ার চক্রান্ত চলছে। আমরা ইউজিকে ন্যায্য দাবির প্ল্যাকার্ড দেখাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু প্রক্টর ও পরিবহন প্রশাসক আমাদের প্রকাশ্যে পিটিয়ে ক্যাম্পাস থেকে তুলে দেওয়ার হুমকি দেন এবং ছাত্রদলকে দিয়ে এই নৃশংস হামলা চালান।”
জবি ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ছাত্রশিবির ও তাদের সহযোগীরা পরিকল্পিতভাবে মব তৈরি করে ইউজিসি চেয়ারম্যানকে অপমান করার চক্রান্ত করছিল। সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের প্রতিহত করেছে এবং ক্যাম্পাসের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তাদের তাড়িয়ে দিয়েছে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন অনাকাঙ্ক্ষিত এই ঘটনার জন্য গভীর দুঃখ প্রকাশ করে জানান, একটি জাতীয় স্মারক অনুষ্ঠানে এরূপ পরিস্থিতি কোনোভাবেই কাম্য নয়।
ঘটনার সার্বিক কারণ উদঘাটনে প্রশাসন ৩ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে এবং দ্রুত রিপোর্ট পেশ করতে নির্দেশ দিয়েছে। সূত্রাপুর থানার পুলিশ জানিয়েছে, জবি ক্যাম্পাস ও হাসপাতাল এলাকায় বিপুলসংখ্যক অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন রাখা হয়েছে।

