রাজপথের সিপাহসালার থেকে বঙ্গভবনের পথে: ২৩তম রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল

0
রাজপথের সিপাহসালার থেকে বঙ্গভবনের পথে: ২৩তম রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল

বাংলাদেশ প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়েছেন দলের মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সংসদীয় গণতান্ত্রিক রীতি ও সংবিধানের বাধ্যবাধকতা মেনে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার পরপরই তিনি সরকার ও দলের সব দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেছেন।

আজ বৃহস্পতিবার সকালে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির যৌথ বৈঠকে মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপ্রধানের পদে সমর্থনের সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। বৈঠকের পর দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী সাংবাদিকদের আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেন:

“আমাদের দীর্ঘ সংগ্রাম ও আন্দোলনের সিপাহসালার মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি ইতঃমধ্যেই মন্ত্রিত্ব এবং বিএনপির মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন।”

সাধারণত বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একক প্রার্থী থাকায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচনের রেওয়াজ থাকলেও, এবার তা ভিন্ন রূপ নিতে যাচ্ছে। সংসদের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের পক্ষ থেকে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ১৯৯১ সালের পর এই প্রথম জাতীয় সংসদে প্রত্যক্ষ ব্যালট ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন।

তবে জাতীয় সংসদে ক্ষমতাসীন বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিজয় ও দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ কেবলই সময়ের ব্যাপার বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

রাজপথ থেকে রাজপ্রাসাদ: শিক্ষকতা থেকে রাষ্ট্রপতি পদের পথচলা

১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম নেওয়া মির্জা ফখরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৭২ সালে বিসিএস (শিক্ষা) ক্যাডারের মাধ্যমে ঢাকা কলেজে অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা পরিদপ্তর, ইউনেস্কো জাতীয় কমিশন এবং ১৯৭৯ সালে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এস. এ. বারীর একান্ত সচিব হিসেবে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৬০-এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (ইপিএসইউ) সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হল শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে রাজনীতি শুরু করেন। ১৯৬৯-এর ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি ছাত্র ইউনিয়ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হিসেবে রাজপথের মিছিলে নেতৃত্ব দেন এবং কারাবরণ করেন।

১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে তিনি মূলধারার রাজনীতিতে আসেন এবং ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ৯০-এর দশকে এরশাদ বিরোধী আন্দোলন চলাকালে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন এবং ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি মনোনীত হন।

২০০১ সালে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ২০০১-২০০৬ মেয়াদে কৃষি ও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

২০০৯ সালে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং ২০১১ সালে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ থেকে দীর্ঘ এক দশক ধরে তিনি বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। দলীয় সংকটের সময় কঠোর রাজপথের আন্দোলন পরিচালনা করে তিনি দলমত নির্বিশেষে সর্বজনগ্রাহ্য নেতা হয়ে ওঠেন।

মির্জা ফখরুলের পিতা মরহুম মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী। তাঁর চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন সাবেক স্পিকার ও আইনমন্ত্রী এবং অপর চাচা উইং কমান্ডার এস. আর. মির্জা ছিলেন ১৯৭১ সালের মুজিবনগর সরকারের যুব শিবির অধিদপ্তরের পরিচালক।

ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর স্ত্রী রাহাত আরা বেগম একজন বীমা ব্যক্তিত্ব। এই দম্পতির দুই কন্যা সন্তান রয়েছে—জ্যেষ্ঠ কন্যা ড. মির্জা শামারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষিকা ও বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় গবেষক এবং কনিষ্ঠ কন্যা মির্জা সাফারুহ ঢাকায় শিক্ষকতা করছেন।