বিশ্বকাপ ট্রফি নিয়ে মাদ্রিদে স্পেনের ট্রাফালগার উল্লাস: ১৮ লাখ মানুষের মহাসমুদ্রে রাজকীয় সংবর্ধনা

0
বিশ্বকাপ ট্রফি নিয়ে মাদ্রিদে স্পেনের ট্রাফালগার উল্লাস: ১৮ লাখ মানুষের মহাসমুদ্রে রাজকীয় সংবর্ধনা

ক্রীড়া প্রতিবেদক: আমেরিকার নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাজমুকুট জয় করে সোমবার (২০ জুলাই) নিজ দেশে ফিরেছে স্পেন জাতীয় ফুটবল দল। ট্রফি নিয়ে পৌঁছানোর পরপরই বিশ্বজয়ী ‘লা রোহা’ বীরদের বরণ করে নেয় পুরো দেশ। স্প্যানিশ রাজধানী মাদ্রিদ পরিণত হয় লাল-হলুদের এক মহাসমুদ্রে। প্রায় ১৮ লাখ ভক্তের উপস্থিতিতে রাজপরিবারের সৌজন্য সাক্ষাৎ থেকে শুরু করে খোলা ছাদযুক্ত বাসের ঐতিহাসিক ছাদ-খোলা শোভাযাত্রায় মেতে ওঠে পুরো দেশ।

সোমবার বিকেলে মাদ্রিদে পৌঁছানোর পর ২৬ সদস্যের বিশ্বজয়ী দলটি সরাসরি চলে যায় জাজুয়েলা প্রাসাদে। সেখানে স্পেনের রাজা ৬ষ্ঠ ফিলিপ ও রানি লেটিজিয়া খেলোয়াড়দের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। পরবর্তীতে দলটির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ।

প্রধানমন্ত্রী সানচেজের বাসভবন মনক্লোয়া প্যালেসের সামনে থেকে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বহর খোলা ছাদযুক্ত বাসে চড়ে ঐতিহাসিক বিজয় শোভাযাত্রা শুরু করে। ‘স্টার্স শাইন টুগেদার’ এবং ‘সোমোস কাম্পেওনেস’ (আমরাই চ্যাম্পিয়ন) লেখা বিশেষ ছাদখোলা বাসে বিশ্বজয়ী ট্রফি হাতে রদ্রি, লামিন ইয়ামাল, নিকো উইলিয়ামস ও ফেরান তোরেসদের নাচ-গানে মেতে উঠতে দেখা যায়।

মাদ্রিদের প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে ছাদখোলা বাসের মিছিল গিয়ে পৌঁছায় বিশ্ব ফুটবলের ঐতিহাসিক উল্লাসকেন্দ্র ‘সিবেলেস চত্বরে’ (Plaza de Cibeles)। তীব্র গরম ও ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা উপেক্ষা করে ভোর থেকেই ছাতা ও জাতীয় পতাকা হাতে স্থান দখল করে রেখেছিলেন লাখ লাখ সমর্থক। স্থানীয় নগর কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ভেন্যু ও সংলগ্ন সড়ক মিলিয়ে প্রায় ১৮ লাখ মানুষ একনজর স্পেনের ফুটবল বীরদের দেখতে ভিড় জমান।

মঞ্চে দাঁড়িয়ে কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে অশ্রুসজল কণ্ঠে আবেগঘন বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, “স্পেনকে অশেষ ধন্যবাদ। আমাদের পাশে থাকা এবং এই ভালোবাসা দেওয়ার জন্য আমরা চিরকৃতজ্ঞ। আমার দলে থাকা ২৬ জন অসাধারণ মানুষ শুধু খেলোয়াড় নন, তারা বিশ্বসেরা। তাদের কোচ হতে পারা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় গর্বের। আমরা একসঙ্গে থাকলে আরও শক্তিশালী। স্পেন দীর্ঘজীবী হোক!”

অনুষ্ঠানে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় (গোল্ডেন বল বিজয়ী) ও দলীয় অধিনায়ক রদ্রিকে সমর্থকরা রাজকীয় করতালি ও গানে বরণ করে নেন। নিজের ২৫তম জন্মদিনে বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে মঞ্চে প্রবেশ করেন আরেক তারকা অ্যালেক্স বায়েনা।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত রোববারের ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ের ১০৬তম মিনিটে বদলি ফরোয়ার্ড ফেরান তোরেসের চোখধাঁধানো গোলে আর্জেন্টিনাকে ১-০ ব্যবধানে হারায় স্পেন। ৯০ মিনিট নির্ধারিত সময়ে প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনাকে একচ্ছত্র চাপে রেখেও আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজের রেকর্ড ১২টি সেভের কারণে জালের দেখা পাচ্ছিল না লা রোহা। ১০৩ মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজ লাল কার্ড দেখলে ১০ জনের দলে পরিণত হয় আর্জেন্টিনা, যার সুযোগ নিয়ে ৩ মিনিট পরেই জয়সূচক গোলটি করেন তোরেস।

এই জয়ের মাধ্যমে একাধিক ঐতিহাসিক রেকর্ড নিজেদের নামে লিখেছে স্পেন, ২০২৩ সালে নারী বিশ্বকাপ জয়ের পর এবার পুরুষ বিশ্বকাপও জেতায় একই সময়ে পুরুষ ও নারী—উভয় বিভাগে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন থাকা ইতিহাসের প্রথম দেশ হলো স্পেন। কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনে স্পেন তাদের অপরাজিত থাকার ধারাবাহিকতা টানা ৩৮ ম্যাচে উন্নীত করেছে, যা ইউরোপীয় পুরুষ ফুটবলের সর্বকালের নতুন রেকর্ড।

মেগা ফাইনালটি স্টেডিয়ামে সরাসরি প্রত্যক্ষ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউডিয়া শেইনবাউম ও কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। খেলাই শেষেই তাঁরা বিজয়ী স্পেন দলকে শুভকামনা জানান।

দেশজুড়ে এই আনন্দ-উচ্ছ্বাসের মাঝেও নেমে আসে এক মর্মান্তিক শোকের ছায়া। রাজধানীর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সালামাঙ্কায় ১৩ বছর বয়সী এক কিশোর বন্ধুদের সঙ্গে বিজয়ের উল্লাস করার সময় একটি ঐতিহাসিক ঝরনায় (ফাউন্টেন) উঠে পড়ে। কাঠামোগত ধসে সেটি ভেঙে পড়লে মারাত্মক আহত হয়ে শিশুটির অকালমৃত্যু হয় বলে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় পুলিশ।

বিয়োগান্তক এই ঘটনা ছাড়া মাদ্রিদজুড়ে সোম থেকে মঙ্গলবার ভোর পর্যন্ত চলে বিজয় উদযাপন। ২০১০ সালের পর ১৬ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষা শেষে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ ট্রফি দেশে ফেরায় এক নতুন যুগের সূচনা দেখছে স্প্যানিশ ফুটবল।