আহা কী সুন্দর এক সন্ধ্যা – দিলীপ গুহঠাকুরতা

0

দিলীপ গুহঠাকুরতা: দীর্ঘ আট মাস পর প্রনস কোর মেম্বারদের সাথে একসাথে দেখা হলো। কত আনব্দ হোল। পারভীন আপার আতিথেয়তা, আপা ও ইতরাত ভাইয়ের সীমাহীন আন্তরিকতা কোন নিক্তি দিয়ে মাপা সম্ভব নয়।

আমি যখন গুলশানে নির্দিষ্ট সড়ক ল্যান্ডমার্কের দোতলায় সি-১ এপার্টমেন্টে প্রবেশ করছি, তখন কাছাকাছি কোথাও কোন মসজিদের মুয়াজ্জিনের কণ্ঠ নিসৃত মাগরিবের আজান ধ্বনি লাউড স্পিকারের সাহায্যে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। বাসার ভেতরে ঢোকা মাত্র প্রথমেই ওয়েলকাম ড্রিংক। পারভীন আপা ডিক্যান্টার থেকে ক্রিস্টালের গ্লাসে রঙিন শরবত ঢেলে আমার হাতে দিলেন। প্রথম চুমুকেই দেহ-মন-প্রাণে একটা প্রশান্তির ঢেউ খেলে গেলো।

এরপর শেতশুভ্র মর্মর পাথরের ডাইনিং টেবিলের ধার ঘেঁষে খালি থাকা একটা সুদৃশ্য আরামদায়ক কুশন চেয়ারে বসা মাত্র কোথা থেকে যেন অসংখ্য আইটেমে সজ্জিত রকমারি ইফতার ভর্তি আর্কোপালের ডিনার প্লেট উড়ে এসে আমার সামনে টেবিলের উপরিতলে স্থিত হলো। চিরকালের পেটুক আমি অন্য কারো সাথে হাই হ্যালো করার আগেই প্লেট থেকে হাপুসহুপুস কিংবা হালুমহুলুম খাওয়া শুরু করে দিলাম।

খাবার প্লেট যখন খালি হয় হয়, তখন আমার নজর একে একে টেবিলে উপবীত অতিথিদের দিকে নিবদ্ধ হোল। সবাই সারাদিনের রোজার পরে আহারে নিবেদিত। আমার কাছেই শহীদুল ভাই। তার পাশে রেবেকা আপা, এরপরে দুলাভাই। তারপর রোজ ভাই। এইভাবে ক্লকওয়াইজ ঘুরে চোখের দৃষ্টি দিলাম চন্দন আপা, নাহিদ আপা, মহুয়া আপা, শিরিন চায়না আর মাফরুহা মিতুর দিকে। পাশের রুম থেকে প্রায় খালি প্লেট হাতে তখন উদয় হলেন রফিক ভাই। এরপরে দেখা পেলাম সাফা স্যার, শরীফ ভাই আর মেরাজ ভাইয়ের। কেবল ওদিকে ইতরাত ভাই আর পারভীন আপা সারাক্ষণই ব্যস্ত অতিথি সেবায়। ইফতারের পর সকলে জামাতে নামাজ কায়েম করলেন।

ডাইনিং টেবিল ছেড়ে এরপর আমরা সবাই বসলাম সুপ্রশস্থ লিভিং রুমে। শুরু হলো জম্পেশ আড্ডা। অনেক দিন পর প্রনস বাগিচার গানের পাখিরা একসাথে হয়ে কলকাকলি শুরু করলেন। তাঁদের সুমধুর কলতান মনে হলো পারভীন আপার ছবির মতো সুন্দর ডুপ্লেক্স বাড়ির দেয়াল ভেদ করে পশ্চিমে সড়ক পর্যন্ত পৌঁছে গেলো, আর পূর্বে গুলশান লেকের বৃহৎ জলরাশি তরঙ্গায়িত হোল। সব সেলিব্রিটি শিল্পীদের মধ্যে হংস মাঝে বক যথা নাদান আমি ঘাড় কখনো ডানে কখনো বাঁয়ে ঘুরিয়ে সবার মজার মজার কথা গোগ্রাসে গিলতে লাগলাম। এর মাঝে পারভীন আপা ধোঁয়া ওঠা এককাপ গরম দুধচা আমাকে সহ একে একে সবার হাতে উঠিয়ে দিলেন। আহ, কী সে স্বোয়াদ। আমার সমস্ত দেহমন চায়ের পরশ পেয়ে চনমনিয়ে উঠলো।

এদিকে খাপছাড়া কথার ফুলঝুরি এক দিকে প্রবাহিত হয়ে প্রনস এর খাপে প্রবেশ করলো। অনেক আলাপ আলোচনা, প্রস্তাব পাল্টা প্রস্তাবের পর স্থির হোল – আগামী ২৭ মে নজরুল জয়ন্তী উপলক্ষে প্রনস-অঞ্জলি শিরোনামে একটি মনোজ্ঞ সঙ্গীত সন্ধ্যার আয়োজন করা হবে। এব্যাপারে প্রনস সদস্য প্রসিদ্ধ বাচিক শিল্পী AL Meraz ভাই ফেসবুকে গতকালই একটা বিস্তারিত পোস্ট দিয়েছেন।

প্রনস অনুষ্ঠান নিয়ে আলোচনা চলতে চলতে পারভীন আপা রসুই থেকে পোরসিলিনের এক বিশাল পাত্রে রাইতা সদৃশ্য দৈ এর গ্রেভিতে ডোবানো অনেক গুলো দহিবড়া নিয়ে হাজির হলেন। প্রথমে দু একজন সিরামিকের জামবাটিতে দহিবড়া ঢেলে চামচ দিয়ে কেটে অংশ বিশেষ মুখের ভেতরে রেখে পরম তৃপ্তির সাথে স্পেশাল খাবারটির গুণাগুণ প্রচার করলেন, তখন বাকিরা সবাই কিছুক্ষণের জন্য হলেও চলমান আড্ডার বিরতি দিয়ে দহিবড়ার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়লেন।

এইভাবে সময় এগিয়ে যাচ্ছিল। মেরাজ ভাই অনেক দূরের পথে যাবেন বলে বিদায় নিলেন। এরপর আমি পারভীন আপার অনুমতি চাইলাম – ‘আমারও যে এবার উঠতে হবে। কাল সকালে আমার অফিস’। কিন্তু অনুমতি মিললো না। পারভীন আপা ঘোষণা দিলেন, “উনোনে কাচ্চিবিরিয়ানি রান্না ইতোমধ্যে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। কেউ ডিনার না করে ঘরের চৌকাঠ পার হতে পারবেন না।” কী আর করা। সোফার অসম্ভব নরম ফোমের আসনে শরীরটা আবার ডুবিয়ে দিলাম।

প্রসঙ্গের পর প্রসঙ্গ এসে প্রনসের তুমুল আড্ডা চলতে লাগলো, প্রাণখোলা হাসি আনন্দের মাঝে যা কখনো ঝুলে পড়েনি। এইভাবে আলাপ চলতে চলতে ডিনার টেবিলে রান্নার সুগন্ধি ডাক দিলো। এক্সট্রা লং গ্রেইন বাসমতি চালের কাচ্চিবিরিয়ানি প্লেটে নেয়ার পর মুখে দিয়ে বিশ্বাস হতে মন চায়নি ঘরে বানানো কাচ্চির এতো স্বাদ হতে পারে। রফিক সুলায়মান ভাই বিশেষায়িত করলেন, “হবে না কেনো? এ যে কাচ্চি আপার কাচ্চিবিরিয়ানি।” সত্যিই পারভীন আপা বহু গুণে গুণান্বিতা। আসলেই আপা কেবল পরিপাটি চুল বাঁধেন না, তিনি খুব খুব ভালো রান্না করতে জানেন। বিরিয়ানির সাথে গ্রিল চিকেন – খেতে খেতে ক্লান্ত হয়ে গেলাম। এরপরে আবার জাফরানি রঙের জর্দা দিয়ে মিষ্টি মুখ।

এরপর বাকি থাকলো ঘরে ফেরা। এতো আনন্দের মাঝে মনের সুক্ষ্ম কোণে একটা মুখ এসে উঁকি দিয়ে গেলো। আহারে আজ ও যদি থাকতো, কতো খুশিই না হোত। কবি কীটস এর সেই পুরাতন কথাটি যেন প্রতিধ্বনিত হোল – আমাদের সবচেয়ে সুমধুর গানগুলোর মাঝে কোথাও যেন একটা করুণ সুর সযতনে লেপ্টে থাকে।