‘বংশপরম্পরার রাজনীতি আর নয়, যোগ্যতার ভিত্তিতে চলবে দেশ’: ফেনীতে জামায়াত আমিরের উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা

0
‘বংশপরম্পরার রাজনীতি আর নয়, যোগ্যতার ভিত্তিতে চলবে দেশ’: ফেনীতে জামায়াত আমিরের উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা

ফেণী জেলা প্রতিনিধিঃ ‘রাজার ছেলে রাজা হবে—এই সামন্ততান্ত্রিক ও বস্তাপচা প্রথা ভেঙে চুরমার করে দিতে হবে। ক্ষমতার উত্তরাধিকার কোনো পারিবারিক সম্পত্তি নয়; বরং মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে যোগ্য ব্যক্তিই রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেবেন।’ শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) ফেনী শহরের ঐতিহাসিক পাইলট স্কুল মাঠে আয়োজিত এক বিশাল নির্বাচনী জনসভায় এই হুংকার দেন বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।

২০২৬ সালের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ফেনীর এই জনসভাটি জামায়াতের শক্তি প্রদর্শনের এক বড় মঞ্চে পরিণত হয়। জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে ডা. শফিকুর রহমান কেবল রাজনৈতিক বার্তাই দেননি, বরং ফেনীসহ সারা দেশের জন্য একগুচ্ছ ‘উন্নয়ন ব্লু-প্রিন্ট’ তুলে ধরেন।

বক্তব্যের শুরুতেই ডা. শফিকুর রহমান রাজনৈতিক শিষ্টাচারের এক অনন্য উদাহরণ তৈরি করেন। তিনি বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলেন, “আধিপত্যবাদ ও বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বেগম জিয়া ছিলেন এক আপসহীন ও লড়াকু সেনাপতি। তিনি কখনো দেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে আপস করেননি। সার্বভৌমত্ব রক্ষার এই আপসহীন সংগ্রামের জন্য আমরা তাকে জানাই অকৃত্রিম অভিনন্দন ও শ্রদ্ধা।”

 

দেশের ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জামায়াত আমির বলেন, “আমরা যুবকদের হাতে ‘বেকার ভাতার’ তকমা দিয়ে তাদের ভিক্ষাবৃত্তি বা পরনির্ভরশীলতায় অভ্যস্ত করতে চাই না। যুবকদের ভাতা দিয়ে অপমানিত করার দিন শেষ। জামায়াত ক্ষমতায় গেলে প্রতিটি যুবককে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা হবে, যেন তারা নিজেরাই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে।” এসময় তিনি ফেনী নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে শহীদ হওয়া আবরার ফাহাদের সাহসিকতাকে জাতির প্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করেন।

ফেনীবাসীর দীর্ঘদিনের বঞ্চনার কথা উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান তিনটি প্রধান প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেন:

১. শিক্ষা ও স্বাস্থ্য: তিনি ঘোষণা দেন, দেশের প্রতিটি জেলায় সরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হবে। ফেনীবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী এখানে একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি মেডিকেল কলেজ নির্মাণ করা হবে যা হবে বিশ্বমানের।

২. ক্রীড়া ও প্রবাসীদের সম্মান: ফেনীর অর্থনীতিতে প্রবাসীদের বিশাল অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “ফেনীর সূর্যসন্তানরা বিদেশের মাটিতে রক্ত পানি করে দেশের অর্থনীতি সচল রাখছেন। অথচ এখানে আন্তর্জাতিক মানের কোনো বিনোদন বা ক্রীড়া ব্যবস্থা নেই। আমরা ফেনী স্টেডিয়ামকে সংস্কার করে একটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ও ফুটবল ভেন্যু হিসেবে গড়ে তুলব।”

৩. নদী রক্ষা ও সীমান্ত কূটনীতি: ফেনীর সীমান্ত এলাকা ও বাঁধ সমস্যা নিয়ে তিনি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্মানজনক আলোচনার আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, “নিজের দেশকে রক্ষা করা আমার অধিকার এবং পবিত্র দায়িত্ব। আমরা ভারতের সঙ্গে সমমর্যাদার ভিত্তিতে আলোচনা করে নদী ও বাঁধ সমস্যার এমন সমাধান আনব যেন এদেশের এক ইঞ্চি মাটিও ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।”

ফেনীর জনসভা শেষে ডা. শফিকুর রহমানের ক্লান্তিহীন নির্বাচনী প্রচারণার চিত্র উঠে আসে তার সফরসূচিতে।

ফেনী থেকে তিনি সরাসরি যাত্রা করেন লক্ষ্মীপুরের উদ্দেশ্যে। এরপর সন্ধ্যা থেকে রাত অবধি কুমিল্লার লাকসাম ও কুমিল্লা মহানগরীর জনসভায় ভাষণ দেবেন।

৩১ জানুয়ারি সকালে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে জনসভা এবং দুপুর নাগাদ নিমসার ও দাউদকান্দিতে পথসভা করবেন তিনি। এরপর ঢাকায় ফিরে বিকেলে ঢাকা-১১ এবং সন্ধ্যায় ঢাকা-১০ আসনের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেওয়ার মাধ্যমে তিনি তার এই ঝটিকা সফর শেষ করবেন।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জামায়াত আমিরের এই বক্তব্যে একদিকে যেমন জাতীয়তাবাদের সুর ছিল, অন্যদিকে তেমনি আধুনিক ও কারিগরি শিক্ষাভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ার অঙ্গীকার ছিল। বিশেষ করে ‘মেধাতন্ত্র’ বা ‘মেরিটক্রেসি’র কথা বলে তিনি তরুণ ভোটারদের কাছে একটি নতুন রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন।