আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র, নিচে মাইন: হরমুজ প্রণালির মরণকূপ থেকে ফিরে অবিশ্বাস্য গল্প শোনালেন ক্যাপ্টেন

0
আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র, নিচে মাইন: হরমুজ প্রণালির মরণকূপ থেকে ফিরে অবিশ্বাস্য গল্প শোনালেন ক্যাপ্টেন

বাংলাদেশ প্রতিবেদকঃ পারস্য উপসাগরে চার মাস ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের থমথমে যুদ্ধাবস্থা, চোখে মুখে মৃত্যুর ছাপ আর চারপাশের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ পেরিয়ে অবশেষে স্বদেশের মাটিতে পা রাখলেন সরকারি জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’র বীর নাবিকেরা। মঙ্গলবার (২১ জুলাই) বিকেলে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান হয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায় তাঁদের বহনকারী বিমানটি। জেনেশুনেও রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় জীবন বাজি রাখার অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা এবং মরণকূপ থেকে ফেরার লোমহর্ষক বিবরণ শোনালেন জাহাজটির ক্যাপ্টেন মো. শফিকুল ইসলাম।

বিমানবন্দরের টার্মিনালে প্রবেশ করতেই বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) কর্মকর্তারা ফুল দিয়ে বরণ করে নেন যুদ্ধক্ষেত্র জয় করে ফেরা নাবিকদের। বাইরে উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষায় থাকা স্বজনেরা নাবিকদের দেখতে পেয়েই কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন।

এক আবেগঘন সংবাদ সম্মেলনে ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম বলেন, “আলহামদুলিল্লাহ, আমরা সত্যি দ্বিতীয় জীবন পেলাম। দেশবাসী যাঁরা আমাদের জন্য দোয়া করেছেন, মানসিক শক্তি দিয়েছেন এবং প্রতিনিয়ত খোঁজখবর রেখেছেন—সবার কাছে আমরা চিরকৃতজ্ঞ।”

গত ২৭ ফেব্রুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে পৌঁছানোর পরদিনই যুদ্ধ শুরু হলে চরম নিরাপত্তাঝুঁকির মধ্যে আটকে পড়ে জাহাজটি। জেবেল আলী বন্দরের সেই রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার কথা মনে করে ক্যাপ্টেন শফিকুল বলেন, এক রাতে তাঁদের জাহাজের পাশের বার্থেই একটি শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। মুহূর্তেই তেলের একটি ট্যাংকারে ভয়াবহ আগুন ধরে যায়, যা ছয়টি টাগবোট দিয়েও নেভানো সম্ভব হয়নি। ট্যাংকারটির ৪০টি তেলের ট্যাংকের যেকোনো একটি বিস্ফোরিত হলেই ছাই হয়ে যেত ‘বাংলার জয়যাত্রা’।

জাহাজের তৎকালীন কমান্ডিং অফিসার প্রণয় কৃষ্ণ সেন জানান এক চরম কারিগরি সংকটের কথা। যুদ্ধের কারণে গোটা এলাকার স্যাটেলাইট নেভিগেশন (GPS) ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। সমুদ্রের ওই অংশে ভাসমান মাইন ছড়ানো থাকায় সামান্যতম দিকভুলে জ্যান্ত সমাধির ঝুঁকি ছিল। তবুও অভিজ্ঞ নাবিকেরা সম্পূর্ণ ম্যানুয়াল নেভিগেশনের মাধ্যমে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে জাহাজটিকে বিপদসীমা পার করান।

ক্যাপ্টেন জানান, পারস্য উপসাগরে দীর্ঘ চার মাস অবরুদ্ধ থাকার সময় অন্যান্য অনেক বিদেশি জাহাজের নাবিকেরা চরম মানসিক ট্রমা ও বিষণ্নতায় ভোগেন, এমনকি বিনা চিকিৎসায় কেউ কেউ মারাও যান। অনেক জাহাজে তীব্র খাদ্য ও পানীয় সংকট দেখা দেয়, কোনো কোনোটি প্রণালি পার হতে গিয়ে ডুবেও যায়।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বারবার নাবিকদের জাহাজ ছেড়ে নিরাপদ হোটেলে আশ্রয় নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষার স্বার্থে জীবনকে তুচ্ছ করে জাহাজেই অবস্থান করার দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত নেন দেশের এই সাহসী সন্তানেরা।

২ ফেব্রুয়ারি: ভারত থেকে পণ্য নিয়ে হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করে ‘বাংলার জয়যাত্রা’।

২৭ ফেব্রুয়ারি: কাতার থেকে স্টিল কয়েল বোঝাই করে জেবেল আলী বন্দরে নোঙর করে।

২৮ ফেব্রুয়ারি: যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালালে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে জাহাজটি।

২৩ জুন: দীর্ঘ ১১৫ দিন পর ইরানি বাহিনীর বিশেষ অনুমতি পেয়ে অক্ষত অবস্থায় হরমুজ প্রণালি পার হয় জাহাজটি।

বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ও দূরশিক্ষণ যোগাযোগের কারণেই রাষ্ট্রীয় সম্পদসহ নাবিকদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে বলে গভীর কৃতজ্ঞতা জানান ক্যাপ্টেন। স্বদেশের মাটিতে পা দিয়ে জীবনের চরম দুঃস্বপ্নকে পেছনে ফেলে এখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন ‘বাংলার জয়যাত্রা’র উদ্ধার পাওয়া নাবিক ও তাঁদের পরিবার।