আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষা (নিট/NEET) প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমনে পুলিশি অত্যাচারের প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে ভারতের জাতীয় রাজনীতি। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের আবেদন ও উচ্চ নিরাপত্তা বলয়ের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর লোককল্যাণ মার্গের বাসভবনের সামনে রাতভর অবস্থান-বিক্ষোভের ডাক দিয়েছিলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। এর জেরে রাহুল গান্ধী, প্রিয়ঙ্কা গান্ধী ও মল্লিকার্জুন খড়্গেসহ একাধিক বিরোধী নেতাকে আটক করে দিল্লি পুলিশ। পরবর্তীতে দীর্ঘ নাটকীয়তা ও ব্যাপক রাজনৈতিক উত্তেজনার পর তাদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র ডাকে দিল্লির মিছিলে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাসের ব্যবহারের পর। শিক্ষার্থীদের ওপর ‘পুলিশি হামলা’র প্রতিবাদে মোদীর বাসভবনের অদূরে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন রাহুল গান্ধী, প্রিয়ঙ্কা গান্ধী এবং সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব। পাশাপাশি দুই কংগ্রেস শাসিত রাজ্য—কেরলের মুখ্যমন্ত্রী ভি ডি সতীশন ও কর্নাটকের উপ-মুখ্যমন্ত্রী ডি কে শিবকুমারও এই বিক্ষোভে যোগ দেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মোদীর বাসভবন ও আশপাশের এলাকায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (RAF) মোতায়েন করা হয়। সন্ধ্যা নামতেই রাহুল-প্রিয়ঙ্কাদের বলপূর্বক গাড়িতে তুলে আটক করে নিয়ে যায় দিল্লি পুলিশ। রাহুল গান্ধীকে ছত্রসাল স্টেডিয়ামে এবং প্রিয়ঙ্কা গান্ধীকে মন্দির মার্গ থানায় রাখা হয়। রাতে মন্দির মার্গ থানায় পৌঁছান কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীও। অবশেষে কয়েক ঘণ্টা পর দু’জনকেই মুক্তি দেওয়া হয়।
অবস্থানে বসার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) রাহুল গান্ধী লেখেন, “শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা মানে প্রতিটি ভারতীয় পরিবারের ওপর হামলা। প্রধানমন্ত্রী মোদী মনে করেন যে তিনি কোনও জবাব না দিয়েই পার পেয়ে যাবেন—পারবেন না! ভারতের শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বরকে উপেক্ষা করা যায় না।”
রাহুল গান্ধী ও বিরোধীরা সরকারের সামনে মূলত চারটি প্রধান দাবি তুলে ধরেছেন, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের তাৎক্ষণিক পদত্যাগ। পুলিশি অত্যাচারের দায় স্বীকার করে মোদী সরকারের প্রকাশ্যে ক্ষমাপ্রার্থনা। সংসদে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পূর্ণাঙ্গ বিবৃতি। সংসদের চলমান বাদল অধিবেশনে নতুন কেন্দ্রীয় শিক্ষানীতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা।
অবস্থান চলাকালে কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিংহ ঘটনাস্থলে গিয়ে অমিত শাহের ‘অনুরোধের’ বার্তা নিয়ে অবস্থান প্রত্যাহারের আবেদন জানান। সরকার সংসদে নিট নিয়ে আলোচনার আশ্বাস দিলেও বিরোধী নেতারা শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফার দাবিতে অনড় থাকায় আলোচনা ব্যর্থ হয়।
সোমবার থেকে শুরু হওয়া সংসদের বাদল অধিবেশনের শুরুতেই এই ঘটনা ঘিরে পারদ চড়েছে। সিজেপি-র যন্তর মন্তরের বিক্ষোভে ইতিমধ্যে সমর্থন জানিয়েছেন সোনম ওয়াংচুক এবং মহারাষ্ট্রের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী উদ্ধব ঠাকরে। সোমবারের খণ্ডযুদ্ধের ঘটনায় ৭০ জনকে পুলিশ ছাড়লেও সরকারি সম্পত্তি নষ্টের অভিযোগে ৬টি এফআইআর দায়ের করা হয়েছে।
বিরোধী জোটে যেমন এই আন্দোলনের প্রভাব পড়েছে, তেমনি পাল্টাপাল্টি রাজনৈতিক তরজাও শুরু হয়েছে:
বিজেপির সমালোচনা: বিজেপি সভাপতি নিতিন নবীন রাহুল গান্ধীর আচরণের তীব্র নিন্দা করে বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের বাইরে রাহুল গান্ধীর আচরণ অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। এটি ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে একটি কালো দিন।” বিজেপির দাবি, শিক্ষার্থীদের নিয়ে রাহুলের কোনো আসল উদ্বেগ নেই, এটি নিছকই রাজনৈতিক কৌশল।
আম আদমি পার্টির (AAP) কটাক্ষ: আপ নেতা সোমনাথ ভারতী রাহুল গান্ধীর এই পদক্ষেপের সমালোচনা করে বলেন, “রাহুল পুরো বিষয়টিকে দুর্বল করছেন। তাঁর যদি সত্যিই শিক্ষার্থীদের সমর্থন করার ইচ্ছা থাকে, তবে তাঁর লোককল্যাণ মার্গ নয়, যন্তর মন্তরে যাওয়া উচিত ছিল।”
দিল্লির রাজপথে পুলিশি বাধা, রাহুলের আটক ও মুক্তি এবং বাদল অধিবেশনের উত্তাপ—সব মিলিয়ে মোদী সরকার ও বিরোধী শিবিরের এই মুখোমুখি অবস্থান ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন করে জলঘোলা করছে।

