বিশেষ প্রতিবেদকঃ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে দুর্নীতির রেকর্ড যেন নিজেরাই নিজেদের ভাঙছে। দেশজুড়ে কুখ্যাত ‘বালিশ-কাণ্ড’-এর রেশ কাটতে না কাটতেই এবার প্রকাশ্যে এলো আরও ভয়াবহ ও বিশাল অঙ্কের আর্থিক অনিয়মের তথ্য। প্রকল্পটিতে গত ৯ বছরে ব্যয় হওয়া প্রায় ৯৪ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে উঠে এসেছে ২৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকার অডিট আপত্তি!
বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প অডিট অধিদপ্তরের (ফাপাড) বিশেষ নিরীক্ষা এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনে প্রকল্পের নজিরবিহীন অরাজকতা, অতিরিক্ত বিল পরিশোধ এবং তদারকহীন বাস্তবায়নের চাঞ্চল্যকর চিত্র ফুটে উঠেছে।
২০১৬ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া এই মেগা প্রকল্পের মোট বাজেট ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা করা হলেও নির্ধারিত সময়ে মেটেনি লক্ষ্য। কিন্তু অর্থ ছাড়ে হয়নি কোনো বিলম্ব:
বিশাল অডিট আপত্তি: ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত মোট ২৩০টি অডিট আপত্তি তোলা হয়েছে।
রেকর্ড অনিয়মের বছর (২০২৩-২৪): এই এক বছরেই ১৬,৬৪৮ কোটি টাকা খরচের বিপরীতে ১৫,২০৭ কোটি টাকারই অনিয়ম চিহ্নিত করেছে ফাপাড।
সাম্প্রতিক অর্থবছর (২০২৪-২৫): সর্বশেষ অর্থবছরেও ৩,৬৯৬ কোটি টাকার অডিট আপত্তি ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে।
প্রকল্পের আওতাধীন ‘গ্রিন সিটি’ আবাসন এলাকা যেন অনিয়মের স্বর্গে পরিণত হয়েছিল। রাশিয়ান কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের জন্য নির্মিত এই হাউজিং প্রজেক্টকে কেন্দ্র করেই তোলা হয়েছে ১২০টি অডিট আপত্তি।
সাবস্টেশন ও জেনারেটর: ১১টি ভবনের ইলেকট্রিক্যাল সাবস্টেশন ও জেনারেটরের প্রকৃত সরকারি মূল্য ছিল ২৭ কোটি টাকা। অথচ ঠিকাদারকে বিল মেটানো হয়েছে ২১৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা! অর্থাৎ, একটি খাতেই অতিরিক্ত গায়েব ১৮৭ কোটি টাকা।
এক ভবনেই পকেটস্থ ১৭.৭৬ কোটি: মাত্র একটি ভবনের ট্রান্সফরমার ও পাওয়ার ফ্যাক্টর প্যানেল কিনতে সরকারি দর ১ কোটি ৮৪ লাখ টাকার জায়গায় বিল করা হয়েছে ১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা!
অভিশপ্ত সেই ‘বালিশ-কাণ্ড’: ৪,৭০২টি বালিশের জন্য বরাদ্দ ছিল ১ কোটি ৪৮ লাখ টাকা, কিন্তু কেনা দেখানো হয় ৫ কোটি ৪১ লাখ টাকায়। কেবল ৬০টি বালিশের প্রতিটির দাম ধরা হয়েছিল ৮৯,৯০০ টাকা।
অর্থনৈতিক হরিলুটের পাশাপাশি কারিগরি তদারকিতেও চরম ব্যর্থতার প্রমান পেয়েছে আইএমইডি। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী প্রতিবছর আপডেট কাজের পরিকল্পনা (অ্যানুয়াল ওয়ার্কপ্ল্যান) দেওয়ার কথা থাকলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রাশিয়ার ‘অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্ট’ ২০১২ সালের পর আর কোনো পরিকল্পনা জমা দেয়নি।
বারবার তাগিদ সত্ত্বেও অসমাপ্ত কাজের কোনো তালিকা দেয়নি ঠিকাদার। ফলে প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনিটের বিদ্যুৎ উৎপাদন কবে নাগাদ শুরু হবে, তার কোনো স্পষ্ট রোডম্যাপ নেই প্রকল্প দপ্তরে।
স্বচ্ছতার এই চরম বিপর্যয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রাজনৈতিক ও অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “রাশিয়া বৈশ্বিক দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশের চেয়েও খারাপ অবস্থায় রয়েছে। পতিত কর্তৃত্বপরায়ণ চোরতন্ত্রের চাপিয়ে দেওয়া এই বিশাল অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত করে রূপপুর থেকে আপাদমস্তক দুর্নীতির বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলতে হবে।”
সাবেক পরিকল্পনা সচিব মো. মামুন আল রশিদ বলেন, সরকারি ক্রয় আইন (পিপিএ) ও ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর) বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কেনাকাটা করা হয়েছে। এই দায় প্রকল্প পরিচালকদের পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ের তদারকি কমিটির ওপরও সমানভাবে বর্তায়।
উল্লেখ্য, প্রকল্পের মূল মেয়াদ ২০২৫ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে তা বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত ঠেলে দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের বর্তমান পরিচালক ড. মো. কবির হোসেনের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

