যশোরে পুত্রবধূকে ধর্ষণচেষ্টাকালে শাশুড়ির দায়ের কোপে ১২ মামলার আসামী চিহ্নিত সন্ত্রাসী জিতু নিহত

0
যশোরে পুত্রবধূকে ধর্ষণচেষ্টাকালে শাশুড়ির দায়ের কোপে ১২ মামলার আসামী চিহ্নিত সন্ত্রাসী জিতু নিহত

যশোর প্রতিনিধি: যশোরে বসতবাড়িতে অনধিকার প্রবেশ করে চাঁদা দাবি, অতর্কিত হামলা এবং গৃহবধূকে মারধর ও জোরপূর্বক ধর্ষণচেষ্টাকালে শাশুড়ির চরম সাহসিকতা ও আত্মরক্ষার জবাবে প্রাণ হারিয়েছেন শরিফুল ইসলাম জিতু (৩৫) নামে এক চিহ্নিত সন্ত্রাসী। গত বুধবার (২২ জুলাই) রাত আনুমানিক ১১টার দিকে যশোর শহরের বারান্দীপাড়া এলাকার ফুলতলা মোড়ে এই ঘটনা ঘটে।

নিহত শরিফুল ইসলাম জিতু ওই এলাকার সিরাজুল ইসলামের ছেলে। পুলিশের রেকর্ডপত্র অনুযায়ী, নিহত জিতুর বিরুদ্ধে হত্যা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও অস্ত্র আইনসহ অন্তত ১২টি ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

এ ঘটনায় সন্ত্রাসীর ধারালো অস্ত্রের হামলায় গুরুতর আহত হয়ে গৃহবধূর শাশুড়ি শুকরান বেগম (৫২) এবং স্বামী সুমন হোসেন (২৮) যশোর জেনারেল হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আহতদের শরীরে একাধিক স্থানে গভীর জখম ও সেলাই রয়েছে, তবে তারা আপাতত আশঙ্কামুক্ত।

হাসপাতালের বেডে শুয়ে ঘটনার রোমহর্ষক বর্ণনা দেন চিকিৎসাধীন আহত শুকরান বেগম। তিনি জানান, বুধবার রাত ১১টার দিকে সন্ত্রাসী জিতু মদ্যপ ও উন্মত্ত অবস্থায় হঠাৎ তাদের ঘরে ঢুকে পড়ে। ঘরে ঢুকেই সে তার ছেলে সুমন হোসেনের কাছে মাদক সেবন ও কেনার জন্য মোটা অঙ্কের টাকা চাঁদা দাবি করে।

সুমন চাঁদা দিতে তীব্র অস্বীকৃতি জানালে জিতু পকেট থেকে ধারালো চাকু বের করে চড়াও হয়। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই সন্ত্রাসীর চাকুর আঘাতে সুমনের মুখের বাঁ পাশের গালে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়।

ছেলের ওপর হামলা ঠেকাতে এবং তাকে রক্ষা করতে মা শুকরান বেগম ছুটে গেলে জিতু তাকেও লক্ষ্য করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। এতে তার হাত ও শরীরের একাধিক স্থানে রক্তাক্ত জখম হয়।

রক্তক্ষয়ী এই তাণ্ডবের একপর্যায়ে সন্ত্রাসী জিতু ঘরের ভেতর সুমনের স্ত্রীকে (শুকরান বেগমের পুত্রবধূ) টেনেহিঁচড়ে জোরপূর্বক ধর্ষণের চেষ্টা চালায়। পুত্রবধূর সম্ভ্রমহানি ও পরিবারের সকল সদস্যের জীবনের চূড়ান্ত ঝুঁকি দেখে শাশুড়ি শুকরান বেগম নিজের যন্ত্রণাকে তোয়াক্কা না করে সাহসিকতার পরিচয় দেন। তিনি ঘরে থাকা একটি ঘরোয়া ধারালো দা হাতে তুলে নিয়ে আত্মরক্ষা ও পুত্রবধূকে বাঁচাতে সন্ত্রাসী জিতুকে লক্ষ্য করে সজোড়ে আঘাত করেন। এতে জিতু মাথায় ও ঘাড়ে কোপ খেয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।

ঘটনার আকস্মিকতায় প্রতিবেশীরা টের পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করেন। সংবাদ পেয়ে যশোর কোতোয়ালি থানা পুলিশের একটি বিশেষ দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশ রক্তাক্ত ও আশঙ্কাজনক অবস্থায় সন্ত্রাসী জিতুসহ আহত মা ও ছেলেকে উদ্ধার করে যশোর জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায়।

যশোর জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক ড. মাসুম বিল্লাহ প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে জিতুর অবস্থার দ্রুত অবনতি দেখে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দেন।

জিতুর স্বজন হাসিনা বানু জানান, চিকিৎসকদের পরামর্শে অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার পথে যশোর-নড়াইল সড়কের নড়াইল জেলার তুলারামপুর এলাকায় পৌঁছালে রাত গভীরের দিকে জিতুর মৃত্যু হয়।

মৃত্যুর পর রাত আনুমানিক ৩টার দিকে মরদেহ পুনরায় ঘুরিয়ে এনে যশোর জেনারেল হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়। চিকিৎসকরা জানান, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হবে।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে যশোর কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাসুম খান জানান “নিহত জিতু ওই এলাকার একজন কুখ্যাত ও চিহ্নিত অপরাধী ছিল। তার বিরুদ্ধে পূর্বে হত্যা, মারামারি ও চাঁদাবাজিসহ ১২টি গুরুতর অপরাধের মামলা রয়েছে। পারিবারিক ও সামাজিক শান্তিশৃঙ্খলা বিঘ্ন ঘটানোয় সে বহুবার পুলিশের হাতে গ্রেফতারও হয়েছিল।”

তিনি আরও যোগ করেন, “সংবাদ পেয়ে পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে ভিকটিমদের উদ্ধার ও আসামীকে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিল। ঘটনাটি আত্মরক্ষা ও ধর্ষণচেষ্টার পরিপ্রেক্ষিতে ঘটেছে বলে প্রাথমিক অভিযোগে উঠে এসেছে। পুলিশ বিষয়টি বিস্তারিত ও গভীরভাবে খতিয়ে দেখছে। এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।”

এলাকাবাসীর একাংশ জানায়, দীর্ঘদিন ধরেই নিহত জিতুর তাণ্ডবে বারান্দীপাড়া ফুলতলা মোড় এলাকার সাধারণ মানুষ চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছিল। গৃহবধূর শাশুড়ির এই অসম সাহসিকতাকে স্থানীয়দের অনেকে জীবন রক্ষা ও আত্মরক্ষার চরম নিদর্শন হিসেবে দেখছেন।