স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিনকে আয়না ঘরে আটকে রেখে ভারতে পাঠানোর চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ!

0
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিনকে আয়না ঘরে আটকে রেখে ভারতে পাঠানোর চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ!

আদালত প্রতিবেদকঃ রাজধানীর উত্তরায় অবস্থিত র‍্যাব-১ কার্যালয়ের গোপন বন্দিশালা বা বহুল আলোচিত ‘টিএফআই সেল’ (যা ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিত) পরিদর্শন করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও প্রসিকিউশন দল। পরিদর্শন শেষে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করে জানিয়েছেন, বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে এই গোপন বন্দিশালারই একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে তাকে ভারতে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়—প্রাথমিক তদন্তে এমন সুস্পষ্ট আলামত ও তথ্য পাওয়া গেছে।

শনিবার (১ আগস্ট) বেলা ১১টার দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে বিচারক ও আইনজীবীদের একটি প্রতিনিধিদল সরেজমিনে এই স্থাপনাটি পরিদর্শন করেন।

চিফ প্রসিকিউটর জানান, তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে ভুক্তভোগীদের বর্ণনার সঙ্গে সরেজমিনের কাঠামোর মিল পাওয়া যাচ্ছিল না। পরবর্তীতে সন্দেহ হলে তদন্ত কর্মকর্তারা কয়েকটি স্থানে নতুন করে নির্মিত দেয়াল অপসারণ করেন। আর তাতেই বেরিয়ে আসে দীর্ঘদিন আড়ালে রাখা ছোট ছোট ২২টি অন্ধকার কক্ষ!

“কয়েকটি কক্ষ এতটাই ছোট যে সেখানে একজন মানুষের স্বাভাবিকভাবে শুয়ে থাকাও সম্ভব নয়। ভুক্তভোগীদের বর্ণনা অনুযায়ী, এখানে হাত ও চোখ বেঁধে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস নির্যাতন চালানো হতো। নিচতলায় এমন একটি কক্ষ পাওয়া গেছে, যাকে ভুক্তভোগীরা ‘ডেথ সেল’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।” — মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম, চিফ প্রসিকিউটর

তিনি স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, অপরাধের আলামত গোপন করতে পরবর্তীতে যারা দেয়াল তুলে কক্ষগুলো আড়াল করার চেষ্টা করেছেন, তদন্ত শেষে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পরিদর্শনের সময় তদন্তকারীরা ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাশিম আরমানের বর্ণনা করা নির্দিষ্ট কক্ষটিও শনাক্ত করতে সক্ষম হন। তবে সালাহউদ্দিন আহমেদ বা আরমানের মতো অনেকে ফিরে এলেও এখনও নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় আড়াই শতাধিক মানুষ। বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলী এবং সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ অনেকেরই আজ পর্যন্ত কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

সংবাদ সম্মেলনে চিফ প্রসিকিউটর উল্লেখ করেন, সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদ এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৬১ ও ১৬৭ ধারা অনুযায়ী গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও এসব ক্ষেত্রে তা সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি এই অবৈধ আটক, গুম ও নির্যাতন স্রেফ আইনের ব্যত্যয় নয়—এগুলো সরাসরি মানবতাবিরোধী অপরাধ।

আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে বিচার প্রক্রিয়া পরিচালনার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, মাঠপর্যায়ে যারা এসব অপরাধের নির্দেশ ও বাস্তবায়নে ছিলেন, তাদের পাশাপাশি তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়ও ‘সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি’ (Superior Responsibility) নীতির আওতায় এনে তদন্ত করা হচ্ছে।

র‍্যাব-১ এর টিএফআই সেল পরিদর্শনের পর এবার ট্রাইব্যুনালের বিচারকেরা ঢাকা সেনানিবাসের ভেতরে অবস্থিত ডিজিএফআই-সংশ্লিষ্ট কথিত গোপন আটককেন্দ্র ‘জেআইসি’ (JIC) পরিদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন। আগামী শনিবার বিচারকরা সেখানে পরবর্তী বিচারিক পরিদর্শনে যাবেন।

পরিদর্শনের সময় উপস্থিত ছিলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার, সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, গাজী এমএইচ তামিম, ফারুক আহাম্মদ, শাইখ মাহদীসহ প্রসিকিউশন টিম ও আসামিপক্ষের আইনজীবীবৃন্দ। গুম কমিশনের সদস্য নুর খান লিটন এবং গুমের শিকার সাজেদুল ইসলাম সুমনের বোন সানজিদা ইসলাম তুলি।