
সাইফুল আলমঃ সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে আইনজীবী, এমনকি গণমাধ্যমের সংবাদগুলোতেও অহরহ একটি বাক্য বন্ধনী ব্যবহৃত হয়—“আদালত আসামিকে জামিন দিয়েছেন।” কিন্তু আইনি পরিভাষা, আইনের গঠন এবং ফৌজদারি কার্যবিধির (Code of Criminal Procedure) মূল দর্শনের দিকে তাকালে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে: আদালত কি সত্যিই জামিন দেয়, নাকি আদালত আসামির কাছ থেকে জামিন ‘গ্রহণ করেন’ বা ‘নেন’?
ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই ভাষাগত ও ব্যাখ্যামূলক বিভ্রান্তি কেবল শব্দের লড়াই নয়, বরং এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বিচারপ্রক্রিয়ার গভীর অর্থ, আসামির মুক্তি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নিবিড় সম্পর্ক।
ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ (CrPC)-এর বিভিন্ন ধারার শিরোনাম ও ভেতরের বিধানগুলোর দিকে নজর দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়-
ধারা ৪৯৭ (অজামিনযোগ্য অপরাধ) এই ধারার ইংরেজিতে শিরোনাম হলো—“When bail may be taken in case of non-bailable offence.” অর্থাৎ, আইন বলছে আদালত জামিন ‘নেবেন’ (Take), দেওয়ার কথা বলা হয়নি।
ধারা ৪৯৮ (জামিনের পরিমাণ কমানো) এই ধারায় উল্লেখ আছে—*“bail required… be reduced.” অর্থাৎ, জামিনের জন্য নির্ধারিত সিকিউরিটি বা অর্থের পরিমাণ কমানোর কথা বলা হয়েছে।
ধারা ৪৯৯ (বন্ড ও সিউরিটি) আদালত আসামিকে মুক্তি দেওয়ার সময় আসামির নিজস্ব ‘বন্ড’ (Bond) এবং একজন বা একাধিক জামানতদারের (Surety) কাছ থেকে আর্থিক নিশ্চয়তা গ্রহণ করেন।
আইনের দৃষ্টিতে, ‘জামিন’ (Bail) কোনো শারীরিক মুক্তি বা দয়ার দান নয়; জামিন হলো আসামিকে বিচারে হাজির রাখার জন্য একটি নির্ধারিত আর্থিক সিকিউরিটি বা গ্যারান্টি। আর ‘মুক্তি’ (Release) হলো সেই সিকিউরিটি জমা দেওয়ার পর আসামির প্রাপ্ত সাময়িক স্বাধীনতা। ফলে ব্যাকরণগত ও আইনগতভাবে—আদালত সিকিউরিটি (জামিন) গ্রহণ করেন/নেন, এবং বিনিময়ে আসামিকে সাময়িক ‘মুক্তি দেন’।
আমাদের সমাজ ও প্রচলিত প্র্যাকটিসে ‘জামিন’ শব্দটিকে জেলখানা থেকে সাময়িক বের হওয়ার সমার্থক হিসেবে দেখা হয়। এই ধারণার কারণেই বলা হয় “আদালত জামিন দিলেন”।
কিন্তু যদি ‘জামিন’ মানেই সাময়িক মুক্তি হতো, তবে সিআরপিসির ৪৯৮ ধারায় জামিন কমানোর (Reduce) কথা বলা হতো না—কারণ শারীরিক মুক্তিকে গাণিতিকভাবে কমানো বা বাড়ানো যায় না, কমানো যায় কেবল জামিনের আর্থিক অঙ্ককে। একইভাবে, সিআরপিসির ৫ম তফসিলের ২ নম্বর ফরমেও ‘জামিন’-কে একটি সুনির্দিষ্ট অর্থের পরিমাণ (Sum of Money) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাস্তব বিচারিক চর্চায় আদালত যখন ‘জামিন গ্রহণ’ না করে স্রেফ কিছু কাগজে সই নিয়ে (বন্ড) আসামিকে ছেড়ে দেন, তখন আইনের আসল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়।
আইনের মূল স্পিরিট ছিল, জামিনদার বা সিউরিটি হবেন এমন ব্যক্তি যার আর্থিক দায়িত্ব থাকবে। কিন্তু বর্তমানে আদালতে নামকাওয়াস্তে সিউরিটির সই নেওয়া হয়। ফলে আসামি জামিন পেয়ে পালিয়ে গেলে বা পুনরায় অপরাধ করলে সিআরপিসির ৫১৪ ধারা অনুযায়ী সেই অর্থ আদায় করা সম্ভব হয় না।
বড় অপরাধের ক্ষেত্রে যদি আদালত উপযুক্ত এবং আদায়যোগ্য আর্থিক জামিন (Bail) না নিয়ে কেবল নামমাত্র বন্ডে ছেড়ে দেন, তবে আসামির মনে বিচার এড়ানোর প্রবণতা বা নতুন অপরাধে লিপ্ত হওয়ার সাহস তৈরি হয়।
আইনের সঠিক পাঠ বলে—আদালত জামিন প্রদান করেন না, আদালত উপযুক্ত সিকিউরিটি বা অর্থ জমার শর্তে জামিন ‘গ্রহণ করেন’ এবং আসামিকে সাময়িক মুক্তি ‘দেন’।
ভাষাগতভাবে “আদালত জামিন দিয়েছেন” বলা সহজ মনে হলেও, আইনি চর্চায় এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটি বোঝা জরুরি। আদালত যদি জামিনকে স্রেফ একটি কাগুজে ফর্মালিটি না বানিয়ে আইনের মূল স্পিরিট অনুযায়ী উপযুক্ত জামানত বা সিকিউরিটি ‘নেওয়ার’ মাধ্যম হিসেবে কঠোরভাবে প্রয়োগ করেন, তবে বিচার এড়ানোর প্রবণতা কমবে এবং সমাজে আইনের শাসন সুদৃঢ় হবে।
লেখকঃ আইনজীবী
০১৭১১৯৪২২৯৪, [email protected]
