বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস ২০২৬

0
বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস ২০২৬

আলতাফ হোসেন সরকারঃ প্রতিবছর ৮ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস পালিত হয়। ১৯৯৬ সালে ওয়ার্ল্ড ফিজিওথেরাপি (World Physiotherapy) আনুষ্ঠানিকভাবে ৮ সেপ্টেম্বরকে বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস হিসেবে নির্ধারণ করে। মূলত ১৯৫১ সালের এই দিনে আন্তর্জাতিক সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

এই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৭ সাল থেকে আমি বাংলাদেশে বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস পালন করা শুরু করি। তখন দেশে ফিজিওথেরাপি পেশা সম্পর্কে মানুষের ধারণা ও সচেতনতা ছিল সীমিত। নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ফিজিওথেরাপির গুরুত্ব ও সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরা, পেশাটির যথাযথ মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত এবং বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবসের একত্রিক করার লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে দেশের ফিজিওথেরাপিস্ট, শিক্ষার্থী, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং পেশাজীবী সংগঠনের সক্রিয় অংশগ্রহণে দিবসটির উদযাপন আরও বিস্তৃত হয়েছে।

২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য

২০২৬ সালের বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবসের মূল প্রতিপাদ্য:

“Cardiovascular Disease and Stroke”

“হৃদরোগ ও স্ট্রোক প্রতিরোধ, ব্যবস্থাপনা ও পুনর্বাসনে ফিজিওথেরাপি এবং শারীরিক কার্যকলাপের ভূমিকা।”

এই প্রতিপাদ্যের উদ্দেশ্য হলো হৃদরোগ ও স্ট্রোক প্রতিরোধে নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপের গুরুত্ব তুলে ধরা এবং আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসা, ব্যবস্থাপনা ও পুনর্বাসনে ফিজিওথেরাপির কার্যকর ভূমিকা সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা।

হৃদরোগ ও স্ট্রোক প্রতিরোধে ফিজিওথেরাপি

অলস জীবনযাপন, দীর্ঘ সময় বসে থাকা, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অতিরিক্ত ওজন, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। নিয়মিত হাঁটা, উপযুক্ত ব্যায়াম এবং সক্রিয় জীবনযাপন এসব ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

একজন দক্ষ ফিজিওথেরাপিস্ট ব্যক্তির বয়স, শারীরিক সক্ষমতা, রোগের ধরন ও ঝুঁকির মাত্রা বিবেচনা করে নিরাপদ এবং ব্যক্তিভিত্তিক ব্যায়াম পরিকল্পনা তৈরি করতে পারেন। পাশাপাশি তিনি সঠিক শারীরিক কার্যকলাপ, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন সম্পর্কে প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করেন।

স্ট্রোক-পরবর্তী পুনর্বাসনে ফিজিওথেরাপি

স্ট্রোকের পর অনেক রোগীর শরীরের এক পাশ দুর্বল বা অবশ হয়ে যেতে পারে। তাঁদের হাঁটাচলা, ভারসাম্য রক্ষা, বসা থেকে দাঁড়ানো, হাত-পা নাড়ানো, সিঁড়ি ব্যবহার এবং দৈনন্দিন কাজ সম্পাদনে অসুবিধা দেখা দেয়। দ্রুত ও পরিকল্পিত পুনর্বাসন শুরু করা হলে রোগীর কর্মক্ষমতা ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।

স্ট্রোকের পর যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী যোগ্য ফিজিওথেরাপিস্টের তত্ত্বাবধানে পুনর্বাসন শুরু করা জরুরি। তবে রোগীর অবস্থা মূল্যায়ন না করে নিজে থেকে কঠিন ব্যায়াম শুরু করা উচিত নয়।

বাংলাদেশ ফিজিওথেরাপি অ্যাসোসিয়েশনের ভূমিকা

বর্তমানে বাংলাদেশ ফিজিওথেরাপি অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএ) হৃদরোগ ও স্ট্রোক প্রতিরোধে জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং স্ট্রোক-পরবর্তী রোগীদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে কাজ করছে। বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচি, বৈজ্ঞানিক আলোচনা, প্রশিক্ষণ, সেমিনার এবং জনসেবামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে সংগঠনটি ফিজিওথেরাপির গুরুত্ব মানুষের কাছে তুলে ধরছে।

ফিজিওথেরাপিস্টরা শুধু ব্যায়াম করান না; তাঁরা রোগীর শারীরিক সমস্যা মূল্যায়ন করেন, বৈজ্ঞানিকভাবে চিকিৎসা ও পুনর্বাসন পরিকল্পনা তৈরি করেন এবং রোগীকে স্বাভাবিক ও কর্মক্ষম জীবনে ফিরে যেতে সহায়তা করেন। তাঁদের আন্তরিক সেবা, সহানুভূতিশীল আচরণ ও নিয়মিত সহযোগিতার কারণে রোগীরা ফিজিওথেরাপিস্টদের প্রতি গভীর আস্থা ও ভালোবাসা প্রকাশ করেন।

স্ট্রোক প্রতিরোধ, প্রাথমিক সচেতনতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনে বাংলাদেশ ফিজিওথেরাপি অ্যাসোসিয়েশনের ধারাবাহিক কার্যক্রম দেশের মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হলে অসংখ্য রোগী উপকৃত হবেন এবং সমাজে স্ট্রোকজনিত অক্ষমতার বোঝা কমানো সম্ভব হবে।

বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস শুধু একটি পেশাজীবী দিবস নয়; এটি সুস্থ, সক্রিয় ও কর্মক্ষম জীবন গড়ে তোলার একটি বৈশ্বিক সচেতনতা আন্দোলন। হৃদরোগ ও স্ট্রোক প্রতিরোধ থেকে শুরু করে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা, পুনর্বাসন, আত্মনির্ভরশীলতা ও জীবনমান ফিরিয়ে আনতে ফিজিওথেরাপির অবদান অপরিসীম।

আসুন, বিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আমরা সবাই নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকার অঙ্গীকার করি এবং হৃদরোগ ও স্ট্রোক প্রতিরোধ ও পুনর্বাসনে ফিজিওথেরাপির গুরুত্ব মানুষের কাছে পৌঁছে দিই।

প্রফেসর ডা. আলতাফ হোসেন সরকার, পিএইচডি মাসকিউলোস্কেলেটাল ডিজঅর্ডারের অ্যাসোসিয়েট ফিজিশিয়ান বিশেষজ্ঞ

০১৭৮৫৯৯৯৯৭৭