গাজীপুর প্রতিনিধিঃ বাসা ভাড়া দিতে না পেরে ঘরছাড়া এক অসহায় নারী আশ্রয় খুঁজেছিলেন মাওনা উড়ালসেতুর নিচে। কিন্তু সেখানে আশ্রয়ের প্রলোভন দেখিয়ে দুই শিশুর চোখের সামনেই ওই নারীকে (২৭) ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে পান ব্যবসায়ী সোহরাব হোসেনের বিরুদ্ধে। শুধু তা-ই নয়, নির্মম এ ঘটনা ধামাচাপা দিতে টাকার প্রস্তাব এবং প্রাণে মেরে ফেলার হুমকির মুখে বিচার না পেয়ে কোলে থাকা সন্তান নিয়ে মহাসড়কে চলন্ত গাড়ির নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা চালান ওই মা।
গত মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) রাতে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মাওনা চৌরাস্তা এলাকার একটি পানের আড়ত-সংলগ্ন নির্জন স্থানে এই নারকীয় ঘটনা ঘটে। বৃহস্পতিবার সকালে গুরুতর আহত সন্তানকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর পুরো বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে মাওনা এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
ভুক্তভোগী নারী জানান, প্রায় এক বছর আগে স্বামী ছেড়ে যাওয়ার পর দুই সন্তানকে নিয়ে জৈনা বাজার এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন তিনি। কিন্তু অর্থাভাবে বাসা ভাড়া পরিশোধ করতে না পারায় মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বাড়ির মালিক দুই শিশুসহ তাকে বাসা থেকে বের করে দেন। নিরুপায় হয়ে রাতের আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে মাওনা উড়ালসেতুর নিচে যান তিনি।
অভিযোগ অনুযায়ী, রাত সাড়ে ১০টার দিকে নেত্রকোনার বাসিন্দা ও মাওনা চৌরাস্তার পান ব্যবসায়ী সোহরাব হোসেন (৩৫) ওই নারীকে নিরাপদে থাকার আশ্রয়ের কথা বলে পানের আড়তের পেছনের নির্জন স্থানে নিয়ে যান। সেখানে দুই শিশুর সামনেই তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেন তিনি। শিশুদের আকুল আকুতি ও ডাক-চিৎকারেও থামেনি অপরাধী। অত্যাচার শেষে ভুক্তভোগীকে সেখানে ফেলে রেখেই চম্পট দেন সোহরাব।
পরদিন বুধবার সকালে বিচার চাইতে ও অভিযুক্তকে খুঁজতে তার দোকানে যান ভুক্তভোগী নারী। তিনি স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ীকে ঘটনাটি জানালে সোহরাবের দুই সহযোগী পান ব্যবসায়ী গৌতম ও শহীদ টাকার বিনিময়ে বিষয়টি রফাদফা ও ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চালান।
ধর্ষকদের অনৈতিক প্রস্তাব এবং সহযোগীদের হুমকির মুখে বিচার পাওয়ার আশা ছেড়ে দেন ওই নারী। চরম ক্ষোভ ও মানসিক যন্ত্রণায় বুধবার সকালে কোলে থাকা শিশু সন্তানকে নিয়ে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে চলন্ত গাড়ির নিচে ঝাঁপ দেন তিনি। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করলেও গাড়ির আঘাতে তার ছেলে গুরুতর আহত হয়।
ধর্ষক সোহরাব ও তার সহযোগীদের অব্যাহত প্রাণনাশের হুমকির কারণে দুই দিন পর্যন্ত ঘটনাটি পুলিশ বা স্থানীয়দের জানাতে সাহস পাননি ওই মা। এমনকি ভয়ের কারণে আহত সন্তানের চিকিৎসাও করাতে পারেননি।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সকালে সন্তানের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে বাধ্য হয়ে তাকে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকদের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পুরো সত্য বেরিয়ে আসে এবং মুহূর্তের মধ্যেই খবরটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরেই শ্রীপুর থানা পুলিশ ভুক্তভোগী নারীকে উদ্ধার করে নিজেদের হেফাজতে নেয়। ঘটনার পরপরই অভিযুক্ত সোহরাব এলাকা ছেড়ে পালিয়েছেন।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ শাহীনূর আলম জানান, “এক অসহায় নারী পাশবিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার খবর পাওয়ার পরপরই তাকে উদ্ধার করে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।”
তিনি আরও জানান, মূল অভিযুক্ত সোহরাব পলাতক রয়েছে। তাকেসহ জড়িতদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম অভিযানে নেমেছে। এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া দ্রুতগতিতে চলছে।
অসহায়ত্ব ও গৃহহীনতার সুযোগ নিয়ে এমন বর্বর নির্যাতন এবং বিচারপ্রার্থী মাকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেওয়ার এই ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

