অর্থনৈতিক প্রতিবেদকঃ “জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে এর প্রভাব পড়বে না”—বাণিজ্যমন্ত্রীর এই আশ্বাসের ঠিক ২৪ ঘণ্টা যেতে না যেতেই রাজধানীর বাজারগুলোতে দেখা দিয়েছে বিপরীত চিত্র। তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি এসে পড়েছে সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে। পরিবহন খরচ বাড়ার অজুহাতে একদিনের ব্যবধানে রাজধানীর বাজারগুলোতে সবজিসহ একাধিক নিত্যপণ্যের দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এতে করে স্বস্তির আশায় থাকা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের পরিবারগুলোতে নতুন করে চরম অস্বস্তি ও নাভিশ্বাস ফিরে এসেছে।
গত ২০ সেপ্টেম্বর ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ায় সরকার, যা ২১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়। চলতি বছরেই এ নিয়ে ১৯ এপ্রিল ও ১ জুনের পর তৃতীয় দফায় জ্বালানির দাম বাড়ানো হলো। আর এর সরাসরি ধাক্কা এসে লেগেছে খুচরা বাজারে।
বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার রাজধানীর ধুপখোলা, রায়সাহেব বাজার ও মিরপুরের বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা যায়, সবজির দামেই সবচেয়ে বেশি অস্থিরতা।
বেগুন ও গাজর: গত সপ্তাহে ১৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া গোল বেগুন এখন কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লম্বা বেগুনের দাম কেজিপ্রতি ১০-২০ টাকা বেড়ে ১০০ থেকে ১২০ টাকায় ঠেকেছে। গাজরের দাম কেজিপ্রতি ২০ টাকা বেড়ে এখন ১৪০ টাকা।
অন্যান্য সবজি: ঝিঙের দাম ২০ টাকা বেড়ে ১০০ টাকা এবং লাউয়ের দাম প্রতিটি ৫০-৬০ টাকা থেকে বেড়ে ৭০-৮০ টাকায় উঠেছে। এছাড়া পটোল ও ঢেঁড়শ কেজিতে ১০-২০ টাকা বেড়ে ৬০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। করলার কেজি মানভেদে ৮০ থেকে ১০০ টাকা।
অপরিবর্তিত পণ্য: কাঁচা মরিচ আগের মতোই ১৬০ টাকা, শসা ৬০ টাকা এবং পেঁপে ৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
মিরপুর-১ নম্বরের ব্যবসায়ী নাসির জানান, আগে যশোর থেকে কারওয়ান বাজারে এক ট্রাক বেগুন আনতে যেখানে ১৮ হাজার টাকা ভাড়া লাগত, তেলের দাম বাড়ায় তা এখন ২১ হাজার টাকায় ঠেকেছে। ফলে পাইকারি বাজারেই দাম বেড়ে গেছে।
তবে ক্রেতাদের অভিযোগ ভিন্ন। মিরপুরের ক্রেতা রাসেল বলেন, “ট্রাকভাড়া বাড়লে পণ্যের দাম কেজিতে ১-২ টাকা বাড়তে পারে। কিন্তু পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা সুযোগ বুঝে একলাফে ১০-২০ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে। বাজারে তদারকি না থাকাতেই এই নৈরাজ্য।”
সবজির মতো ফার্মের মুরগি ও ডিমের বাজারও বেশ চড়া। ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ১৮৫ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা দেড় মাস আগের তুলনায় কেজিতে প্রায় ২০ টাকা বেশি। সোনালি মুরগি ৩৪০ থেকে ৩৬০ টাকা এবং ডজনপ্রতি ফার্মের ডিম ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বিক্রেতারা জানান, অতিবৃষ্টি ও গরমে খামারে উৎপাদন কমার পাশাপাশি মুরগির খাবার ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধিই দাম চড়া থাকার মূল কারণ।
এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো আটা ও ময়দার দাম বাড়িয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান মিল্কভিটার দেখাদেখি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও পাস্তুরিত তরল দুধের দাম লিটারে ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছে। তবে চালের বাজারে এখন পর্যন্ত তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়তে দেখা যায়নি।
সবজির বাজারে আগুন থাকলেও মাছের বাজারে এখন পর্যন্ত তেলের দামের বড় কোনো প্রভাব পড়েনি। তবে পরিবহন খরচ বাড়তে থাকলে সামনে মাছের দামও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন রায়সাহেব বাজারের মাছ বিক্রেতা খাইরুল ইসলাম।
বর্তমানে বাজারে পাঙাশ ২৩ ৩ টাকা, তেলাপিয়া ২৬০ টাকা, পাবদা ৩৫০-৪০০ টাকা এবং চাষের রুই ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
তবে পুরো বাজারের ব্যতিক্রমী স্বস্তি এনে দিয়েছে ইলিশ মাছ। সরবরাহের ওপর নির্ভর করে ইলিশের দাম কেজিতে ৩০০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। আগে ১ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হওয়া ইলিশ এখন ১ হাজার টাকায় এবং ১ হাজার ৬০০ টাকার ইলিশ ১ হাজার ৩০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।
আয়ের সাথে ব্যয়ের সঙ্গতি রাখতে না পেরে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন সীমিত আয়ের মানুষ। বাজার করতে এসে অনেকেই বাধ্য হয়ে তালিকার কাটছাঁট করছেন, কমিয়ে দিচ্ছেন পণ্যের পরিমাণ। সুশাসনের অভাব এবং কার্যকর বাজার তদারকির অভাবেই অসাধু চক্র তেলের দাম বৃদ্ধির সুযোগ নিচ্ছে বলে মনে করছেন ক্ষুব্ধ সাধারণ ক্রেতারা।

