লাইভ লোকেশন পাঠিয়েও বাঁচতে পারল না তাজমিন: বাবার ফোনে আকুল বার্তা, ধানক্ষেতে মিলল কাদামাখা লাশ

0
লাইভ লোকেশন পাঠিয়েও বাঁচতে পারল না তাজমিন: বাবার ফোনে আকুল বার্তা, ধানক্ষেতে মিলল কাদামাখা লাশ

কুমিল্লা প্রতিনিধিঃ কক্সবাজার সফর শেষে মধ্যরাতে বাড়ি ফেরার পথে বাবার মোবাইল ফোনে নিজের সবশেষ ‘লাইভ লোকেশন’ ও বাঁচানোর আকুতি জানিয়ে বার্তা পাঠিয়েছিল কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকার বাসিন্দা সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন (১৫)। কিন্তু ঘুমিয়ে থাকা বাবা সেই আকুল বার্তাটি যখন দেখতে পেলেন, ততক্ষণে বড্ড দেরি হয়ে গেছে—ততক্ষণে জীবনযুদ্ধের ইতি টেনে লালমাইয়ের এক নির্জন ধানক্ষেতে কাদামাখা অবস্থায় জমা পড়েছে মেয়েটির নিথর দেহ।

চাঞ্চল্যকর এই স্কুলছাত্রী হত্যাকাণ্ডে তদন্তে নেমে এক সন্দেহভাজনকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ ছাড়া ঘটনার সাথে জড়িত ও তাজমিনকে বহনকারী চিহ্নিত সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমনকে শনাক্ত করে তার স্বজনদের হেফাজতে নিয়ে জোর চিরুনি অভিযান চালানো হচ্ছে।

তদন্তকারী দল সূত্রে জানা গেছে, ৪ অক্টোবর কুমিল্লা শহরের ভাড়া বাসা থেকে বান্ধবীর বাড়ি যাওয়ার কথা বলে বের হয় তাজমিন। পরবর্তীতে পুলিশি অনুসন্ধানে তাজমিনের ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কক্সবাজার ভ্রমণের তথ্য পাওয়া যায়। বুধবার (৭ অক্টোবর) রাত পৌনে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে ফেরা ‘আইকনিক পরিবহন’-এর একটি বাসে চেপে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার নূরজাহান হোটেলের সামনে এসে নামে সে।

এলাকার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বাস থেকে নেমে তাজমিন হোটেলের পাশের খাবারের দোকান ও কয়েকটি স্টেশনারি দোকানের দিকে যায়। রাত ১২টার দিকে একটি স্টেশনারি দোকানের বিক্রেতার সাথে কথা বলে কোনো দিকনির্দেশনা নেয় সে। এরপর রাত সোয়া ১২টার দিকে নূরজাহান হোটেল এলাকা ছেড়ে বাসায় ফেরার উদ্দেশ্যে একটি নিবন্ধিত সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চড়ে বসে।

তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম জানান, বুধবার গভীর রাতে একাধিকবার কল করা হলেও তাজমিনের মোবাইল ফোনটি রিসিভ হচ্ছিল না। এরপর রাত আনুমানিক ১টা ৪৫ মিনিটে তাজমিন তার বাবার ব্যবহৃত মোবাইলে একটি আকুল বার্তা পাঠায় এবং নিজের অবস্থানের ‘লাইভ লোকেশন’ শেয়ার করে তাকে দ্রুত এসে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানায়।

তাজমিনের বাবা বলেন, “মেয়ে যখন মেসেজ পাঠায়, তখন আমি গভীর ঘুমে বিভোর ছিলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে মেসেজ ও লাইভ লোকেশন দেখে আঁতকে উঠি এবং দ্রুত সেই লোকেশন অনুসরণ করে গিয়ে দেখতে পাই আমার একমাত্র মেয়ের মরদেহ উদ্ধার করছে পুলিশ।”

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ভোরে কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কসংলগ্ন লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি নিভৃত ধানক্ষেত থেকে তাজমিনের কাদাভরা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

সরেজমিনে জগতপুর গ্রামের দুপাশের নির্জন ফসলি জমিতে ৪-৫টি ধানক্ষেতের গাছ এলোমেলোভাবে দুমড়ে-মুচড়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দা রুহুল আমিন ও মো. মুহিন জানান, ধানক্ষেতের অবস্থা দেখে স্পষ্ট বোঝা গেছে যে, কিলারদের হাত থেকে নিস্তার পেতে মেয়েটি জীবন বাজি রেখে মরিয়া হয়ে দৌড়াদৌড়ি ও ধস্তাধস্তি করেছিল। কিছুটা দূরে পড়ে ছিল একটি ভ্যানিটি ব্যাগ এবং কাদা ও সড়কের মাঝখানে উল্টে থাকা একটি নিবন্ধিত সিএনজি অটোরিকশা। তাজমিনের মাথা কাদায় ডুবে ছিল এবং গলায় পেঁচানো ছিল একখণ্ড গামছা।

পুলিশের একাধিক ইউনিট অটোরিকশাটির সূত্র ধরে চালককে শনাক্ত করে। সিএনজি অটোরিকশাটির মালিক নিশ্চিত করেছেন গাড়িটি চালক সুমনের নিয়ন্ত্রণে ছিল।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঘাতক চালক সুমনের মূল বাড়ি চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলায় হলেও সে এতদিন লালমাইয়ের বাগমারা দক্ষিণ ইউনিয়নের জয়নগর গ্রামে তার শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করত। তবে প্রায় এক মাস আগে সে বসতঘর বিক্রি করে উধাও হয়ে যায়। পেশায় চালক সুমন অত্যন্ত মাদকাসক্ত ছিল, সে কোনো মোবাইল ফোন কিংবা জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ব্যবহার করত না। তাকে পাকড়াও করতে পুলিশ তার বোন, বোনের স্বামী ও খালাশাশুড়িকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নিয়ে সুমনের সম্ভাব্য গোপন আস্তানায় তল্লাশি শুরু করেছে।

লালমাই থানা ও কুমিল্লার ডিবি পুলিশের একাধিক দল নিয়ে গঠিত তদন্ত টিম অভিযান চালিয়ে চট্টগ্রাম থেকে উক্ত ঘটনার সাথে সম্পৃক্ততার অভিযোগে ১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিই চালক সুমন কি না, তা তদন্তের স্বার্থে গোপন রাখা হয়েছে।

কুমিল্লার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সদর দক্ষিণ সার্কেল) মোস্তাইন বিল্লাহ্ জানান, “মরদেহের শরীরে বাহ্যিক বড় আঘাতের চিহ্ন না থাকলেও গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করার শক্ত প্রমাণ পাওয়া গেছে। ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট পেলে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট বিবরণ জানা যাবে। ঘটনায় ব্যবহৃত নিবন্ধিত সিএনজি অটোরিকশাটি জব্দ করে মূল আসামিকে ধরতে সকল প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।”

ঘটনায় নিহতের বাবা আবদুল আলীম বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে লালমাই থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। ময়নাতদন্ত শেষে তাজমিনের মরদেহ স্বজনরা যশোরের ছাতিয়ানতলায় পারিবারিক কবরস্থানে দাফনের উদ্দেশ্যে নিয়ে গেছেন। কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান নিশ্চিত করেছেন, হত্যাকাণ্ডের পেছনের মূল মোটিভ ও অপরাধীদের খুব দ্রুতই আইনের আওতায় এনে বিচার সুনিশ্চিত করা হবে।