বাংলাদেশ প্রতিবেদকঃ তরুণ প্রজন্মকে মাদক, ডিজিটাল আসক্তি এবং সামাজিক হতাশার অন্ধকার থেকে ফিরিয়ে আনতে খেলাধুলার ব্যাপক প্রসারের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, “খেলাধুলা কেবল শারীরিক বিনোদন নয়; এটি যুবসমাজের মধ্যে শৃঙ্খলা, অধ্যবসায়, নৈতিকতা ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে। একটি সুসংগঠিত, সুস্থ ও সমৃদ্ধ জাতি গঠন এবং তরুণ সমাজকে সম্ভাব্য ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে মাঠপর্যায়ে খেলাধুলার বিস্তার এখন সময়ের দাবি।”
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রাজধানী ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে ‘আরাফাত রহমান কোকো ১৮তম জাতীয় সামার অ্যাথলেটিকস প্রতিযোগিতা-২০২৬’-এর জমকালো উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন। আয়োজনের শুরুতেই বেলুন ও ফেস্টুন উড়িয়ে এবং রঙিন আতশবাজির ঝলকানিতে তিন দিনব্যাপী এই প্রতিযোগিতার আনুষ্ঠানিক শুভ সূচনা ঘোষণা করা হয়।
বক্তব্যের শুরুতেই অ্যাথলেটিকসের সার্বজনীন গুরুত্ব তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, “অ্যাথলেটিকস হলো সকল ধরনের খেলাধুলার মূল বা জননী (Mother of Sports)। এই ট্র্যাঙ্ক ও ফিল্ডের লড়াইয়ে একজন ক্রীড়াবিদের শারীরিক গতি, শক্তি, ক্ষিপ্রতা, মনস্তাত্ত্বিক শৃঙ্খলা এবং সহনশীলতার প্রকৃত পরীক্ষা নেওয়া হয়। দেশের ক্রীড়াঙ্গনে অ্যাথলেটিকসের ভিত্তি যদি শক্তিশালী হয়, তবে ফুটবল, ক্রিকেটসহ অন্যান্য সকল খেলাধুলার শারীরিক সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।”
তিনি আরও বলেন, “খেলাধুলা আমাদের জাতীয় গৌরব ও ঐক্যবদ্ধতার অনন্য প্রতীক। যখন কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা বিশ্বমঞ্চে উড়তে দেখা যায় এবং বিজয়ী অ্যাথলেটের সম্মানে জাতীয় সংগীত বেজে ওঠে, তখন পুরো জাতি এক পরম গর্বে উদ্বেলিত হয়। এমন গৌরবময় মুহূর্তে ভৌগোলিক বা রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে সবার পরিচয় একটাই হয়ে দাঁড়ায়—‘আমরা বাংলাদেশি’।”
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদদের ধারাবাহিক সাফল্য নিশ্চিত করতে নিজস্ব প্রতিভাবান খেলোয়াড় গড়ে তোলার ওপর জোর দেন রাষ্ট্রপতি। তিনি উল্লেখ করেন, বৈশ্বিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় সাফল্য অর্জন করতে হলে তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রতিভা অন্বেষণ (Talent Hunt) কর্মসূচির কোনো বিকল্প নেই।
দেশের চলমান ক্রীড়া জাগরণের কথা উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, “বর্তমানে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে একটি নতুন উদ্দীপনা ও গতির সঞ্চার হয়েছে। তৃণমূল পর্যায় থেকে সার্বিক খেলাধুলাকে বিশ্বমানে উন্নীত করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিরলস ও যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করছেন। এই দূরদর্শী নেতৃত্বের জন্য আমি প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।”
সরকারের ক্রীড়াবান্ধব উদ্যোগের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি জানান, তরুণদের ক্রীড়ামুখী করা এবং ক্রীড়াবিদদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকার বহুমুখী মেগা প্রকল্প ও নীতি গ্রহণ করেছে। এর আওতায় রয়েছে উদীয়মান খেলোয়াড়দের অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব দিতে বিশেষ কার্ড ও ভাতার ব্যবস্থা।
জেলা পর্যায় পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মানসম্মত সমন্বিত স্পোর্টস ভিলেজ ও অলিম্পিক কমপ্লেক্স গড়ে তোলার পরিকল্পনা। গ্রামীণ তরুণদের খেলাধুলার সুযোগ নিশ্চিতে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে কমপক্ষে একটি করে খেলার মাঠ নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী, যার মাঠপর্যায়ের কাজ ইতিপূর্বে শুরু হয়ে গেছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে দেশের প্রতিটি খেলার মাঠ মুক্ত করে সংরক্ষণ করা এবং শহরাঞ্চলে নতুন খেলার মাঠ চিহ্নিত ও নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষকে কঠোর নির্দেশনা দেন।
ক্রীড়াঙ্গনে লিঙ্গ সমতা ও আর্থিক সুরক্ষার ওপর বিশেষ নজর দিয়ে রাষ্ট্রপতি আহ্বান জানান, কোনো উদীয়মান প্রতিভা যেন কেবল আর্থিক অনটন বা সুযোগের অভাবে ঝরে না পড়ে। এর জন্য তিনি নারী অ্যাথলেটদের সমান সুযোগ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার তাগিদ দেন। একই সাথে জেলা, উপজেলা এবং স্কুল-কলেজ পর্যায়ে নিয়মিত আন্তঃস্কুল ক্রীড়া প্রতিযোগিতা চালুর তাগিদ দেন তিনি।
সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি দেশের শীর্ষস্থানীয় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বীমা ও শিল্পপতিদের ক্রীড়া ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR) থেকে দীর্ঘমেয়াদি স্পন্সর বা পৃষ্ঠপোষক হিসেবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়। তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, ১৮তম জাতীয় সামার অ্যাথলেটিকস প্রতিযোগিতা থেকে এমন কিছু উজ্জ্বল প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদ উঠে আসবে, যারা ভবিষ্যতে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখবে।
উল্লেখযোগ্য যে, দেশের ক্রীড়াঙ্গনে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এবারের সামার অ্যাথলেটিকস প্রতিযোগিতাটি জাতীয় পর্যায়ের বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক ও ক্রীড়ানুরাগী মরহুম আরাফাত রহমান কোকোর স্মৃতির প্রতি উৎসর্গ করা হয়েছে। উদ্বোধনী বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি তাঁর রূহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং ক্রীড়া উন্নয়নে তাঁর অবদানের কথা গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন।
বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের সভাপতি মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ জাবেরের সভাপতিত্বে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য প্রদান করেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক। অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথিদের উপস্থিতিতে স্বাগত বক্তব্য পেশ করেন ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আলী ইমাম তপন।
তিন দিনব্যাপী এই প্রতিযোগিতায় দেশের ৮টি বিভাগ, বিভিন্ন জেলা, শিক্ষা বোর্ড এবং সামরিক ও বেসামরিক বাহিনীর কয়েকশ সেরা অ্যাথলেট বিভিন্ন ট্র্যাক ও ফিল্ড ইভেন্টে লড়াইয়ে অংশ নিচ্ছেন।

