ফ্রান্স উত্তালঃ জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেহাল দশার প্রতিবাদে লাখো মানুষের বিক্ষোভ, গ্রেপ্তার ১,৩০০ ছাড়াল

0
ফ্রান্স উত্তালঃ জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেহাল দশার প্রতিবাদে লাখো মানুষের বিক্ষোভ, গ্রেপ্তার ১,৩০০ ছাড়াল

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ ইউরোপের অন্যতম প্রধান অর্থনীতি ফ্রান্সে জনজীবন এখন চরম সংকটে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, জ্বালানি তেলের চড়া দাম এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর করুণ ও শোচনীয় পরিবেশের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে ফরাসি জনতা। গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) দেশজুড়ে আয়োজিত এই গণবিক্ষোভে অংশ নেন লাখ লাখ মানুষ। আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করায় রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, শনিবারের এই দেশব্যাপী বিক্ষোভে ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। অন্যদিকে, বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়ন ও আন্দোলন পরিচালনাকারী সংগঠনের দাবি, এই সংখ্যাটি ছিল প্রায় ৮ লাখ। এর আগে গত সপ্তাহের বিক্ষোভে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। সেই দফায় সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনায় আড়াই হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং দুই হাজারের বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে জানিয়েছে দেশটির বাণিজ্য ও শিল্প সংশ্লিষ্ট সংগঠন।

দিনের শুরুতে বিক্ষোভের কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হলেও দুপুরের পর থেকে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। প্যারিসে শান্তিপূর্ণ মিছিলের সমাপ্তির ঠিক পরেই পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাওয়া শুরু হয়।

বিক্ষুব্ধ জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস (কাঁদানে গ্যাস) ও জলকামান ব্যবহার করে। এ সময় কিছু উগ্র বিক্ষোভকারী অস্থায়ী ব্যারিকেড তৈরি করে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ও বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপ করেন। মুখোশধারী কিছু তরুণকে গাড়ির শোরুমের জানালা ভাঙচুর করতেও দেখা গেছে।

দক্ষিণের প্রধান বন্দরনগরী মার্সেইয়ে ময়লার পাত্রে অগ্নিসংযোগ এবং সড়কে ব্যারিকেড তৈরি করা হয়। বোর্দো শহরেও সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ভবনের কাঠের পাটাতন খুলে নেওয়ার মতো ধ্বংসাত্মক ঘটনা ঘটে।

লিওঁ শহরে নিষিদ্ধ এলাকায় জড়ো হওয়া বিক্ষোভকারীদের ওপর কাঁদানে গ্যাস প্রয়োগ করে পুলিশ। তুলুজ ও ক্লেরমঁ-ফেরাঁ শহরে সংঘর্ষে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে তুলুজে ২০ বছর বয়সী এক বিক্ষোভকারীর হাতে বিস্ফোরক ফেটে কয়েকটি আঙুল বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় গণমাধ্যম।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ফ্রান্সজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলে প্রশাসন। মোতায়েন করা হয় প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য। ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ এক সংবাদ সম্মেলনে জানান যে, শনিবারের সংঘর্ষে ৫৩ জন পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন। সাধারণ বিক্ষোভকারী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আন্দোলনের পেছনে দীর্ঘমেয়াদী কিছু কারণ রয়েছে। মুদ্রাস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাজেট ও পরিবেশ শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঠিক আর ছয় মাসের মধ্যেই ফ্রান্সে জাতীয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে এই গণবিক্ষোভ রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র উত্তাপ সৃষ্টি করেছে এবং বিরোধী দলগুলোর জন্য এটি একটি বড় রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে এই আন্দোলন বর্তমান সরকারের জনপ্রিয়তাকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।