আনিছ আহমেদঃ বুকের ভেতর শত আর্তনাদ চেপে রেখেও কীভাবে একজন মা বেঁচে থাকেন, তার জ্বলন্ত এক মর্মান্তিক উপাখ্যান শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার নলকুড়া ইউনিয়নের গোমড়া গ্রামের হালিমা খাতুন। দারিদ্র্য, বঞ্চনা আর নির্মম সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করতে করতে হালিমার জীবন এখন এক দীর্ঘ ও অন্তহীন কষ্টের গল্প। বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকার এবং সন্তানের মুখে একমুঠো অন্ন তুলে দেওয়ার লড়াইয়ে প্রতিনিয়ত হেরে যাচ্ছেন এই দুর্ভাগা নারী।
হালিমা খাতুন মৃত হযরত আলী ও রাশেদা বেগম দম্পতির মেয়ে। এক ভাই ও এক বোনকে নিয়ে তাঁদের চার সদস্যের ছোট্ট পরিবারটি কোনোমতে দিন পার করত। সহায়-সম্বল বলতে ছিল কেবল সরকারের দেওয়া ১০ শতাংশ জমির ওপর ছোট্ট একটি মাথা গোঁজার ঠাঁই। প্রায় ১৫ বছর আগে দিনমজুর বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই পরিবারটির জীবনপ্রদীপ যেন নিভু নিভু করতে থাকে। ভাই বিয়ে করে আলাদা হয়ে নিজে দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালালেও অবহেলিত থেকে যান হালিমা ও তাঁর মা।
জীবনের নির্মম বাস্তবতায় একসময় বিয়ে হয় হালিমার। কিন্তু স্বামীর ঘর তাঁর জীবনে কোনো সুখ আনতে পারেনি। অভিযোগ রয়েছে, তাঁর স্বামী চরম মাত্রার নেশাগ্রস্ত, ভবঘুরে ও যৌতুকলোভী। ঘরে খাবার না থাকলেও নেশার অর্থের জন্য কিংবা যৌতুকের লোভ মেটাতে হালিমার ওপর নেমে আসত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। শেষ পর্যন্ত যৌতুকের দাবি পূরণ করতে না পারায় দুই সন্তানের মা হালিমা খাতুনকে একবস্ত্রে স্বামীর সংসার থেকে বের করে দেওয়া হয়। কোলজুড়ে থাকা চার বছরের অবুঝ মেয়ে হাসিকে নিয়ে তখন তিনি পড়েন চরম অনিশ্চয়তা ও অসহায়ত্বের মুখে।
হালিমার জীবনের সবচেয়ে মর্মান্তিক ও হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটানো অধ্যায়টি ঘটে প্রায় দুই বছর আগে। সে সময় জন্ম নেয় তাঁর দ্বিতীয় কন্যাসন্তান। অস্ত্রোপচারের (সিজারিয়ান) মাধ্যমে শিশুটির জন্ম হওয়ায় ক্লিনিক ও ওষুধের খরচ মেটানোর সামর্থ্য তাঁর ছিল না। চিকিৎসার ব্যয় ও দেনার বোঝা কোনোভাবেই সামলাতে না পেরে বুকভাঙ্গা কান্না আর চরম অসহায়ত্ব নিয়ে সেই কচি শিশুটিকে অন্যের কোলে দত্তক দিতে বাধ্য হন তিনি। অভাবের তাড়নায় নিজের সন্তানকে চিরতরে দূরে ঠেলে দেওয়ার মতো এমন অমানবিক সিদ্ধান্ত একজন মায়ের বুক কীভাবে চিরে দেয়, তা কেবল হালিমা কিংবা ভাগ্যবিড়ম্বিত মায়েরা জানেন।
বর্তমানে হালিমা খাতুনের নিজের কোনো স্থায়ী আশ্রয় বা মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও নেই। সহায়-সম্বলহীন এই মা বাধ্য হয়ে নিজের অসুস্থ ও বয়োবৃদ্ধ মা রাশেদা বেগমের আশ্রয়ে দিন কাটাচ্ছেন। রাশেদা বেগম অন্যের বাড়িতে দিনমজুর ও ঝিয়ের কাজ করে যা সামান্য মজুরি পান, তা দিয়েই কোনোমতে চলে হালিমা ও নাতনি হাসির ভরণপোষণ। তবে নিত্যপণ্যের চড়া দামের এই বাজারে সেই সামান্য আয়ে তিনজনের পেট চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। দিনের পর দিন অর্ধাহারে-অনাহারে কিংবা কখনো পুরোপুরি না খেয়ে কাটছে তাঁদের জীবন। যে বয়সে হালিমার রঙিন স্বপ্ন দেখার কথা, সন্তানদের নিয়ে সুন্দর ভবিষ্যতের ছক কষার কথা, সে বয়সে তাঁকে লড়তে হচ্ছে কেবল এক মুঠো ভাতের জন্য।
হালিমা খাতুনের এই কান্না কেবল একটি একক পরিবারের দুঃখগাথা নয়; এটি আমাদের সমাজের অবহেলিত, নিপীড়িত ও প্রান্তিক নারীদের কঠিন বাস্তবতার এক গভীর প্রতিচ্ছবি। একজন মা কেন নিজের কলিজার টুকরো সন্তানকে পেটের দায়ে অন্যের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হবেন?
এখন সময় এসেছে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার। সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিরা, বিভিন্ন মানবিক সংগঠন এবং স্থানীয় প্রশাসন যদি একটু এগিয়ে আসেন—সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় একটি স্থায়ী ঘর, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং সন্তানের লালন-পালনে সহায়তা প্রদান করেন—তবে হয়তো হালিমা খাতুন ফিরে পেতে পারেন তাঁর হারানো আত্মবিশ্বাস ও নতুন জীবনের আলো। একটু সহানুভূতি এবং ন্যূনতম বেঁচে থাকার সুযোগই পারে এই অসহায় মা ও তাঁর মেয়ের মলিন মুখে হাসি ফোটাতে।

