কেশবপুর প্রতিনিধি: খুলনা বিভাগ কৃষিনির্ভর একটি অঞ্চল। এই বিভাগের দশটি জেলার গ্রামাঞ্চলে গরু পালন শুধু একটি পেশা নয় বরং বহু মানুষের জীবনের স্বপ্ন ও ভরসার জায়গা। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খুলনা বিভাগের বিভিন্ন জেলায় গরু চুরির ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে।
প্রায়ই দেখা যায়, এক রাতের ব্যবধানে কৃষকের একমাত্র সম্বল গরুটি উধাও হয়ে যায়। বিষয়টি বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় যেমন উঠে আসছে, তেমনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও এসব ঘটনার ভিডিও ও ছবি ছড়িয়ে পড়ছে। এই চুুরির আতঙ্ক যে কতটা গভীরে পৌঁছেছে, তার একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ পাওয়া গেছে যশোরের কেশবপুর উপজেলার শাহপুর গ্রাম। গ্রামের একজন কবিরাজ ও গরু পালনকারী উজির আলী নিজের গোয়ালঘরের দরজায় একসঙ্গে আটটি তালা এবং ভেতরের শাটারে আরও চারটি তালা লাগিয়েছেন মোট বারোটি তালা।
শুধু একটি গরুকে চোরের হাত থেকে বাঁচানোর জন্যই এই ব্যবস্থা। দরজার এক পাশে লোহার হ্যাসপে সারিবদ্ধভাবে আটটি তালা লাগানো। দরজার ভেতরে শাটারও আলাদাভাবে বানানো, যেখানে চারটি তালা বসানো হয়েছে। প্রথম নজরে এটি একটি সাধারণ দরজার মতো মনে হলেও কাছ থেকে দেখলে বোঝা যায়, এটি কোনো সাধারণ ঘরের দরজা নয় বরং পরিকল্পিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। স্থানীয়রা বলছেন, এমন দৃশ্য এলাকায় আগে কখনও দেখা যায়নি। উজির আলী পেশায় কবিরাজ হলেও পাশাপাশি তিনি গরু পালন করেন। তার ভাষায়, গরু শুধু একটা পশু না, এটা আমার সংসারের ভরসা। অনেক কষ্ট করে গরুটা বড় করেছি। যদি এক রাতে চুরি হয়ে যায়, তাহলে সেই কষ্টের কোনো দাম থাকে না। তিনি বলেন, একটি গরু বিক্রি করে কেউ ছেলের পড়াশোনার খরচ জোগান, কেউ মেয়ের বিয়ের জন্য টাকা জমাতে চান, কেউ আবার চিকিৎসা বা সংসারের অন্য প্রয়োজন মেটানোর স্বপ্ন দেখেন। সেই স্বপ্ন মুহূর্তেই ভেঙে যায়, যখন সকালে উঠে গোয়ালঘর খালি দেখা যায়।
এই বারো তালার গোয়ালঘরের ছবি ও ভিডিও ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, এটি শুধু ফেসবুকে আলোচনায় আসার জন্য করা। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে এলাকায় গরু চুরির ভয় এতটাই বেড়েছে যে উজির আলীর এই সিদ্ধান্ত মোটেও অস্বাভাবিক নয়। বরং অনেকেই মনে করছেন, তিনি যে সাহস করে বিষয়টি প্রকাশ্যে এনেছেন, সেটি অন্যদের চোখে আঙুল দিয়ে বাস্তবতাটা দেখিয়ে দিয়েছে। খুলনা বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় এখন এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে অনেক কৃষক রাতের বেলা গোয়ালঘরের ভেতর মশারি টাঙিয়ে গরুর পাশেই ঘুমান। কেউ আবার বাঁশ, লোহার শিকল, অতিরিক্ত তালা ব্যবহার করছেন। এসব দৃশ্য গ্রামীণ জীবনের নিরাপত্তাহীনতারই প্রতিচ্ছবি। একটি গরু হারানো মানে অনেক সময় একটি পরিবারের পুরো বছরের পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়া। উজির আলী আরও বলেন, ‘আমি আইন নিজের হাতে তুলে নিতে চাই না। শুধু চাই, আমার কষ্টের ফসলটা নিরাপদ থাকুক’। তার মতে, যদি গরু চুরি বন্ধ না হয়, তাহলে গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষিনির্ভর মানুষের জীবনে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বর্তমান গ্রামীণ জীবনে গরু পালনের জন্য কতটা সতর্কতা ও পরিকল্পনা প্রয়োজন তার প্রমান এই ১২ তালার দরজাটি। এটি শুধু একটি ব্যতিক্রমী দৃশ্য নয় এটি হাজারো কৃষকের নিরাপত্তাহীনতা, আতঙ্ক ও পরিশ্রমের সাক্ষ্য।
গরু চুরি শুধু সম্পদ হারানো নয়, এটি মানুষের স্বপ্ন, পরিশ্রম ও ভবিষ্যৎ কেড়ে নেওয়ার নাম। উজির আলীর মতো অনেক গরু চাষী রাতের বেলা গোয়ালঘরের ভেতর মশারি টাঙিয়ে গরুর পাশেই ঘুমান। এ বিষয়ে কেশবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা(ওসি) বলেন, ‘গরু চুরি রোধে পুলিশ তৎপর রয়েছে। সম্প্রতি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং সন্দেহভাজন এলাকায় নিয়মিত টহল জোরদার করা হয়েছে। জনগণ সচেতন হয়ে তথ্য দিলে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছি। তিনি গরু চুরির ঘটনা ঘটলে দ্রুত থানায় জানানোর আহ্বান জানান।

