রানা প্লাজা ট্রাজেডিঃ দুঃসহ জীবন দু-পা হারানো পঙ্গুত্ববরণকারী রেবেকার, নিখোঁজ শাবানার অপেক্ষায় স্বামী-সন্তান 

0
রানা প্লাজা ট্রাজেডিঃ দুঃসহ জীবন দু-পা হারানো পঙ্গুত্ববরণকারী রেবেকার, নিখোঁজ শাবানার অপেক্ষায় স্বামী-সন্তান 

অমর গুপ্তঃ আজ ২৪ এপ্রিল, রানা প্লাজা ট্রাজেডির ১৩ বছর। সেদিনের সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্ব স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। ভয়াবহ সেই বিপর্যয়ের রেশ রয়ে গেছে আজও।

রানা প্লাজার সেই দিনের দুঃসহ স্মৃতি বহন করে চলেছেন দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর গার্মেন্টস শ্রমিক রেবেকা বেগম (৩১)। তার কথায়, দুই পা হারানোর দুঃসহ স্মৃতি বহন করতে হবে আমাকে, যতদিন বেঁচে থাকব ততদিন-ই।

এই উপজেলার আরো একটি পরিবারের স্বামী-সন্তানরা ফিরে আসার অপেক্ষায় আছেন আরেক গার্মেন্টস শ্রমিক গুলশানে জান্নাত শাবানার। সেদিনের দুর্ঘটনার পর থেকে তিনি নিখোঁজ, এমনকি মেলেনি তার মরদেহ টুকুও।

গত বুধবার (২২ এপ্রিল) কথা হয় রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় দুই পা হারিয়ে পঙ্গু হয়ে যাওয়া রেবেকা বেগমের সঙ্গে। একইদিন ওই ঘটনায় নিখোঁজ উপজেলার কাজিহাল ইউনিয়নের ডাঙ্গা গ্রামের গুলশানে জান্নাত শাবানার পরিবারের সঙ্গেও কথা হয় এই প্রতিনিধির।

রেবেকা বলেন, দুই পা হারিয়ে আজ কর্মহীন হয়ে সারাদিন বাড়ীতে বসে বসে দিন-রাত-সকাল কাটছে তার। সন্তানদের নিয়ে কোথাও যেতেও পারেন না। তাদের প্রয়োজনেও তেমন কাজে আসতে পারেন না।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরো বলেন, ‘হয়তো কিছু টাকা পেয়েছি, কিন্তু কেউ কী আমার পা দুটো ফিরিয়ে দিতে পারবে, যা দিয়ে আমি আগের মতো কাজ করতে পারবো, স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারবো?’

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল ঢাকার সাভারে রানা প্লাজা ধসে দুই পা হারিয়েছেন দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার আলাদীপুর ইউনিয়নের বারাই চেয়ারম্যানপাড়া গ্রামের মোস্তাফিজুর রহমানের স্ত্রী রেবেকা বেগম (৩১)।

সেদিনে ভয়াবহ স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে রেবেকা বলেন, ঘটনার আগের দিন অর্থাৎ ২৩ এপ্রিল রানা প্লাজায় ফাটল দেখে বিকেল ৪টায় ছুটি দিয়ে দেয় কর্তৃপক্ষ। পরদিন সকাল ৮টায় যথারীতি কাজে এসে বিল্ডিংয়ের ফাটলের কারণে কাজে যোগ দিতে না চাইলে কর্তৃপক্ষ জানান, কাজে যোগ না দিলে বেতন-ভাতাসহ ওভারটাইমের টাকা দেয়া হবে না। সেই সঙ্গে চাকরিচ্যুতিরও হুমকি দেওয়া হয়। পরিশ্রমের টাকা এবং চাকরি হারানোর ভয়ে অন্যান্য শ্রমিকের সঙ্গে বাধ্য হয়ে কাজে যোগ দেন রেবেকাও।

রেবেকা আরও বলেন, ঘটনার দিন সকাল ৯টায় তার মা চান বানু, দাদি কোহিনুর ও ফুফু রেবেকাসহ কাজে যোগ দেন। কাজে যোগ দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে বিকট শব্দে ধসে পড়ে রানা প্লাজা। দুর্ঘটনায় অচেতন হয়ে তিনদিন আটকে পড়েছিলাম ওই বিল্ডিংয়ের ধ্বংস্তূপের নিচে। জ্ঞান ফিরলে দেখেন চাদিকে অন্ধকার, বাঁচাও বাঁচাও বলে কারা যেন চিৎকার করছে। তখন তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাচ্ছিল। পানি পানি করে চিৎকার করেও পানি পাননি। কখন উদ্ধারকর্মীরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছেন তা বলতে পারেন না। জ্ঞান ফিরলে নিজেকে হাসপাতালের বিছানায় আবিষ্কার করেন। এরপর জানতে পারেন শরীরে অপরিহার্য অঙ্গ দুটি পা ঊরু পর্যন্ত কেটে ফেলা হয়েছে। এরপর দুই পায়ে আটবার অপারেশন করা হয়। দীর্ঘ এক বছর ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে কর্মহীন হয়ে নিজ বাড়ী ফুলবাড়ীতে ফেরেন।

রেবেকা বলেন, ‘সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, ওইদিন আমি আমার মা চান বানু, দাদি কোহিনুর বেওয়া ও ফুফু রাবেয়াসহ পাঁচজনকে হারিয়েছি। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাদের মরদেহটুকুও পাইনি। এরই মধ্যে আমার পঙ্গুত্বজীবন জুড়ে আসে প্রথম সন্তান সিদরাতুন মুনতাহা। বর্তমানে তার বয়স ১১ বছর। সে স্থানীয় একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে এবং ছেলে মাদানী আল নূর (৬) পড়ছে প্রথম শ্রেণিতে। একটা জীবন্ত লাশ হয়ে বেঁচে আছি। পঙ্গুতেœর কারণে সন্তানদের সব আবদার পূরণ করতে পারি না। ইচ্ছে হলেও অন্য মায়েদের মতো নিজের সন্তানদের বাইরে বেড়াতে নিয়ে যেতে পারি না। স্বামীর প্রয়োজনেও কাজে আসতে পারি না। একটা অভিশপ্ত জীবন নিয়ে বেঁচে আছি। সরকারের ঘোষণা ছিল সেই দুর্ঘটনায় দু’টি অঙ্গহানী হলে ১৫ লাখ এবং একটি অঙ্গহানী হলে ১০ লাখ ক্ষতিপূরণ দেবে। নিয়ম অনুযায়ী দুই পা হারানো জন্য ১৫ লাখ টাকা পাওয়ার কথা। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের ভুল তথ্যের জন্য ক্ষতিপূরণের ৫ লাখ টাকা কম পেয়েছি। ১৫ লাখ টাকার স্থলে পেয়েছি ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র। সেই সঞ্চয়পত্রের লভ্যাংশ প্রতিমাসে ৯ হাজার ১০০ টাকা করে পাই। তা দিয়েই বর্তমানে কোনো রকমে কষ্ট করে চলে আমাদের সংসার।’

আতাউর-শাবানা দম্পতির বাড়ি ফুলবাড়ী উপজেলার কাজিহাল ইউনিয়নের ডাঙ্গাপাড়া গ্রামে। গত বুধবার (২২ এপ্রিল) আলাপকালে আতাউর রহমান জানান, দুই সন্তান, স্ত্রী আর মাকে নিয়ে তার সংসার ছিল। ছেলেমেয়েকে মায়ের কাছে রেখে ঢাকায় চাকরি করতেন স্বামী-স্ত্রী। ছেলে সাজ্জাদ আহম্মেদ সজিবের বয়স তখন ৫ বছর আর মেয়ে সোহানা আফরিন সানুর ৩ বছর। ভবন ধসের ৫ মাস পর এলাকায় ফিরে আসেন। ছেলেটা মায়ের কথা কিছুটা বলতে পারে। মায়ের জন্য প্রথম প্রথম খুব কান্নাকাটি করত। কিন্তু মেয়ের তেমন মায়ের কোনো স্মৃতি নেই। এলাকায় ফিরে সন্তানদের মায়ের কাছে রেখে কৃষিকাজ শুরু করেন। সন্তানদের কথা চিন্তা করে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেছেন।

নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকায় নাম ছিল শাবানার। স্বামী আতাউর রহমান ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন ১৩ লাখ টাকা। ছেলেমেয়ে নতুন মায়ের কাছে ভালোই আছে উল্লেখ করে আতাউর বলেন, ‘টাকা হয়তো পেয়েছি, কিন্তু ১৩ বছরেও স্ত্রীর মরদেহটাও দেখতে পাইনি।

মেয়ে সাজ্জাদ আহম্মেদ সজিব এবার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিবে। আর মেয়ে সোহানা আফরিন সানু এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। ওদের মা বেঁচে থাকলে আজ কত খুশি হতো। কত সুন্দর সংসার ছিল আমাদের,’ বলতে বলতে গলা ধরে আসে আতাউরের।

শাবানার মেয়ে সোহানা আফরিন সানু বলেন, ‘তখন আমি অনেক ছোট ছিলাম। মায়ের চেহারাটা মনে নেই। মা কী জিনিস বুঝি না। অন্যের মাকে দেখি। মাকে খুব কাছে পেতে ইচ্ছে করে। আজ মা থাকলে আমাদের কত আদর যত্ন করতেন। মায়ের মুখটা খুব দেখতে ইচ্ছে করে।’