ওসমান গনিঃ কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মেহার গ্রামের এক কোণে পড়ে থাকা এক চিলতে জমি। ঝোপঝাড়ে ভরা, অনুর্বর আর অবহেলিত। যে মাটিকে একসময় সবাই ‘অনাবাদী’ বলে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, আজ সেখানেই সবুজ পাতার আড়ালে ঝুলছে থরে থরে স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের কারিগর আর কেউ নন, মেহার গ্রামেরই সাধারণ এক বাসিন্দা মফিজ। নিজের তাৎক্ষণিক বুদ্ধি আর সামান্য পরিশ্রমে তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন, সদিচ্ছা থাকলে যেকোনো পরিত্যক্ত স্থানই হয়ে উঠতে পারে এক একটি সোনার খনি। মাত্র ৬ শতাংশ পরিত্যক্ত জায়গায় নেপালি ও জাহাজি কলার চাষ করে মফিজ এখন ওই অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতির এক নতুন রোল মডেল।
গল্পের শুরুটা হয়েছিল মাত্র এক বছর আগে। বাড়ির পাশে পড়ে থাকা ওই ৬ শতাংশ জায়গাটি সব সময় আগাছায় ভরে থাকত, কোনো রকম ফসল হতো না সেখানে। অধিকাংশ মানুষ এমন জমি ফেলে রাখলেও মফিজের ভাবনা ছিল ভিন্ন। তিনি নিজ বুদ্ধিতে জায়গাটি কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন এবং ৭০টি কলার চারা রোপণ করেন।
এরপর কেবলই এগিয়ে যাওয়ার গল্প। মফিজের বাড়তি যত্নের ছোঁয়ায় চারাগুলো দ্রুত বাড়তে থাকে। রোপণের মাত্র আট থেকে দশ মাস পর থেকেই গাছগুলোতে কলা ধরা শুরু হয়। আর এখন পুরো বাগান ছেয়ে গেছে অসংখ্য কলার কাঁদিতে।
মফিজের এই কলা চাষের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর অবিশ্বাস্য মুনাফা। যেখানে অন্যান্য ফসলে প্রচুর সার, কীটনাশক ও বিপুল পুঁজির প্রয়োজন হয়, সেখানে কলা চাষে এসবের বালাই নেই বললেই চলে।
চাষি মফিজ জানান “পুরো বাগানটি তৈরি করতে আমার খরচ হয়েছে মাত্র দুই থেকে তিন হাজার টাকা। অথচ এই সামান্য বিনিয়োগের বিপরীতে এ পর্যন্ত আমি প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকার কলা বিক্রি করে ফেলেছি।”
কলা বিক্রির পাশাপাশি তিনি বাড়তি আয় করেছেন কলার চারা (পোল) বিক্রি করে। বাগান থেকে উৎপাদিত চারা বিক্রি করেই তাঁর পকেটে এসেছে আরও ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। মফিজের মতে, এমন কোনো ফসল হয়তো আর নেই, যেখানে মাত্র দুই-তিন হাজার টাকা পুঁজি বিনিয়োগ করে এত বিপুল অঙ্কের টাকা ঘরে তোলা সম্ভব।
বর্তমানে মফিজ প্রতিদিনই বাগান থেকে তাজা কলা সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করছেন। স্থানীয় বাজারে তাঁর কলার বেশ চাহিদা। তিনি নিজে সরাসরি খুচরা বাজারে প্রতি হালি কলা ২৫ থেকে ৩০ টাকা দরে বিক্রি করে থাকেন। আবার সময় বাঁচাতে অনেক সময় পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে পুরো কলার কাঁদি একবারে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি করে দেন।
এখনো তাঁর বাগানে যে পরিমাণ কলার কাঁদি রয়েছে, তা থেকে তিনি চাইলে প্রতিদিনই অনায়াসে দুটি থেকে তিনটি করে কাঁদি কেটে বাজারে নিয়ে যেতে পারেন। বাজারে কলার দাম ভালো থাকায় প্রতিদিনের এই আয় তাঁর সংসারে এনে দিয়েছে দারুণ সচ্ছলতা।
মফিজের এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে অত্যন্ত কম উৎপাদন খরচ এবং সহজ পরিচর্যা। তিনি জানান, কলাবাগানে সার ও কীটনাশক একেবারে কম লাগে, যার ফলে বাড়তি খরচের কোনো চিন্তাই থাকে না।
শুধু কলাই নয়, দূরদর্শী এই চাষি কলাবাগানের চারপাশের ফাঁকা জায়গায় লাগিয়েছেন পেঁপে ও লেবু গাছ। বর্তমানে সেসব লেবু গাছেও ধরেছে প্রচুর পরিমাণে লেবু, যা তাঁর বাগানের উপরি পাওনা (বোনাস) হিসেবে যোগ হয়েছে।
মফিজ এখন কেবল একজন সফল চাষিই নন, বরং সমাজের জন্য এক অনুপ্রেরণার নাম। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি মনে করেন, গ্রামীণ জনপদে যাঁদের বাড়ির পাশে এমন পরিত্যক্ত জায়গা পড়ে আছে, তাঁরা সবাই যদি একটু পরিশ্রম করে কলার চাষ শুরু করেন, তবে স্বল্প পুঁজিতেই চমৎকার লাভ করা সম্ভব। মেহার গ্রামের মফিজের এই উদ্যোগ গ্রামের অন্য বেকার যুবকদেরও দেখাচ্ছে স্বাবলম্বী হওয়ার এক নতুন সহজ চাবিকাঠি।

