চাকরির নামে রাশিয়ান সেনায় বিক্রি: ইউক্রেন সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে কিশোরগঞ্জের জাহাঙ্গীরসহ ৩ বাংলাদেশি নিহত

0
চাকরির নামে রাশিয়ান সেনায় বিক্রি: ইউক্রেন সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে কিশোরগঞ্জের জাহাঙ্গীরসহ ৩ বাংলাদেশি নিহত

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধিঃ উচ্চ বেতনে ভালো চাকরির প্রলোভনে পড়ে রাশিয়ায় গিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধের বলী হলেন আরও তিন বাংলাদেশি রেমিট্যান্স যোদ্ধা। রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত ইউক্রেন সীমান্ত এলাকায় ভয়াবহ মাইন বিস্ফোরণে তাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে মো. জাহাঙ্গীর হোসাইন (২৬) নামে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার এক যুবক রয়েছেন।

শুক্রবার (২২ মে) বিকেলে রাশিয়া থেকে জাহাঙ্গীরের এক সহযোদ্ধা বন্ধু ভিডিও বার্তার মাধ্যমে মৃত্যুর বিষয়টি দেশের স্বজনদের নিশ্চিত করেছেন। করিমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এমরানুল কবির ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

নিহত জাহাঙ্গীর হোসাইন করিমগঞ্জ উপজেলার জয়কা ইউনিয়নের কান্দাইল-বাগপাড়া গ্রামের প্রয়াত হাবিবুর রহমানের ছেলে।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার (১৮ মে) ইউক্রেন সীমান্তের রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত যুদ্ধাঞ্চলে এই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। একই ঘটনায় জাহাঙ্গীরের সঙ্গে আরও দুই বাংলাদেশি নিহত এবং একজন গুরুতর আহত হয়েছেন।

নিহত অপর দুজন হলেন— মাদারীপুরের মো. সুরুজ কাজী ও কুমিল্লার মো. ইউসুফ খান। জাহাঙ্গীরের ছোট ভাই জাভেদ জানান, বর্তমানে রাশিয়ার একটি সেনা ক্যাম্পে কর্মরত টাঙ্গাইলের যুবক মৃদুল এক ভিডিও বার্তার মাধ্যমে এই নির্মম মৃত্যুর খবর তাঁদের পাঠিয়েছেন।

ভিডিও বার্তায় প্রত্যক্ষদর্শী মৃদুল অভিযোগ করেন, ‘আরাফা আল মনোয়ার এজেন্সি’ নামের একটি রিক্রুটিং প্রতিষ্ঠান ভালো বেতনে সাধারণ চাকরির কথা বলে তাঁদের রাশিয়ায় পাঠায়। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর চতুর কৌশলে তাঁদের রাশিয়ান সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে বাধ্যতামূলকভাবে তাঁদের সম্মুখ সমরে (যুদ্ধে) পাঠায় রুশ বাহিনী। এই অকাল ও নির্মম মৃত্যুর জন্য ওই প্রতারক এজেন্সিকে সম্পূর্ণ দায়ী করেছেন তিনি।

জাহাঙ্গীরের এমন আকস্মিক মৃত্যুর খবরে কান্দাইল গ্রামে তাঁর বাড়িতে চলছে মাতম। মা জাকিয়া বেগম ছেলের শোকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। জ্ঞান ফিরলেই বিলাপ করে বলছেন, “আমি আর কিছু চাই না। টাকা-পয়সা লাগবে না, আমার ছেলেটারে শুধু ফেরত চাই।”

আড়াই বছরের অবুজ সন্তানকে কোলে নিয়ে নির্বাক বসে আছেন স্ত্রী মাশুকা হোসাইন। তিনি বলেন, “সংসারের ভাগ্য ফেরাতে ও ভালো চাকরির আশায় ও রাশিয়া গিয়েছিল। কিন্তু জোর করে যুদ্ধে পাঠানো হলো। এই যুদ্ধে শুধু সে একা শেষ হয়নি, আমাদের পুরো পরিবারটাই শেষ হয়ে গেল।”

জাহাঙ্গীরের শ্বশুর রফিকুল ইসলাম জানান, জামাতা যে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছে, তা তাঁরা অনেক পরে জানতে পারেন। জানার পর দ্রুত দেশে ফিরে আসার তাগিদ দিলেও যুদ্ধক্ষেত্রের কড়া নজরদারির কারণে জাহাঙ্গীর আর ফিরতে পারেননি। প্রায় দুই সপ্তাহ আগে পরিবারের সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল জাহাঙ্গীরের। তখন তিনি জানিয়েছিলেন, কিছুদিন নেটওয়ার্কের বাইরে থাকবেন।

পারিবারিক পটভূমি থেকে জানা যায়, জাহাঙ্গীরের বাবা ছিলেন রাজমিস্ত্রি এবং মা জাকিয়া বেগম পোশাক কারখানার শ্রমিক ছিলেন। কোভিড মহামারির সময়ে কাজ হারিয়ে পরিবারটি ঢাকা ছেড়ে গ্রামে চলে আসে। এসএসসি পাসের পর জাহাঙ্গীর ঢাকায় একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি শুরু করলেও আর্থিক সংকটের কারণে আবার গ্রামে ফিরে যান। অবশেষে চার মাস আগে শ্বশুরবাড়ির আর্থিক সহায়তায় ধারদেনা করে জমি বিক্রির টাকায় রাশিয়ার উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন তিনি।

করিমগঞ্জ থানার ওসি এমরানুল কবির বলেন, “অফিসিয়ালি কোনো তথ্য এখনো আমাদের কাছে আসেনি। তবে নিহতের পরিবারের মাধ্যমে আমরা মাইন বিস্ফোরণে জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর খবর পেয়েছি।”

উল্লেখ্য, এর আগে গত ২ মে রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত ইউক্রেন সীমান্ত এলাকায় ড্রোন হামলায় করিমগঞ্জ উপজেলারই জাফরাবাদ ইউনিয়নের মাঝিরকোনা গ্রামের বাসিন্দা রিয়াদ রশিদ (২৮) নামে আরেক বাংলাদেশি তরুণ নিহত হয়েছিলেন। একের পর এক এমন মৃত্যুর ঘটনায় প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।