পিতার ভালোবাসার কাছে হারাল হাওরের স্রোত: নিজের প্রাণ দিয়ে মেয়েকে বাঁচালেন মিলন

0
পিতার ভালোবাসার কাছে হারাল হাওরের স্রোত: নিজের প্রাণ দিয়ে মেয়েকে বাঁচালেন মিলন

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধিঃ বাবারা যে সন্তানের সুরক্ষায় নিজের জীবনও তুচ্ছ করতে পারেন, তারই এক চিরন্তন ও করুণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করে বিদায় নিলেন বাছির উদ্দিন মিলন (৪২)। কিশোরগঞ্জের হাওরে পরিবারের সাথে আনন্দঘন মুহূর্তে হঠাৎ নেমে আসা বিপদে প্রাণপণ লড়াই করে মেজো মেয়ে শেমন্তী আক্তারকে (১৩) মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছেন তিনি। তবে সন্তানকে নিরাপদে ডাঙায় তুলে দিতে পারলেও হাওরের তীব্র চঞ্চল স্রোতের সাথে আর কুলিয়ে উঠতে পারেননি এই স্নেহময় পিতা; নিজেই তলিয়ে যান অতল জলরাশিতে।

গত শুক্রবার (২৪ জুলাই) বিকেলে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার বালিখলা সংলগ্ন মিঠামইন উপজেলার হাসানপুর সেতু এলাকায় এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে। মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে একটি পরিবারের আনন্দের পরিমণ্ডল স্তব্ধ হয়ে রূপ নেয় ঘোর শোকে।

কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার গাইটাল পেট্রোল পাম্প এলাকার বাসিন্দা এবং সাবেক শিক্ষক মো. আবু বাক্কারের ছেলে মিলন কর্মজীবনে ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কর্মক্ষেত্রে প্রতিদিন বহু মানুষের শারীরিক যন্ত্রণা লাঘবের চেষ্টা করা এই মানুষটি প্রিয়জনকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেই বিলীন হয়ে গেলেন।

পরিবারের স্বজনরা জানান, ছুটির অবসরে স্ত্রী ও সন্তানদের একটু আনন্দ দিতে হাওর ভ্রমণে বেরিয়েছিলেন মিলন। তারা একটি নৌকায় করে হাওরের রূপ উপভোগ করছিলেন। একপর্যায়ে করিমগঞ্জের শেষ সীমান্ত ও মিঠামইনের হাসানপুর সেতুর অদূরে একটি নিমজ্জিত (ডুবু) সড়কের কাছে নৌকা ভিড়িয়ে সবাই মিলে হাওরের স্নিগ্ধ পানিতে গোসল করতে নামেন।

পানি ছিটানোর আনন্দময় মুহূর্তের মধ্যেই ঘটে চরম বিপত্তি। অসাবধানতাবশত মেজো মেয়ে শেমন্তী গভীর পানিতে পড়ে তলিয়ে যেতে থাকে। মেয়েকে হাবুডুবু খেতে দেখে বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে পানিতে ঝাঁপ দেন মিলন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, তীব্র স্রোত ও গভীর পানির তোড়কে উপেক্ষা করে তিনি মেয়েকে আঁকড়ে ধরেন। শেষ শক্তির সবটুকু দিয়ে মেয়ে শেমন্তীকে ভাসিয়ে তুলে নিরাপদে পৌঁছাতে সক্ষম হলেও, অতিরিক্ত পরিশ্রমে মিলন আর নিজেকে সামলাতে পারেননি। স্রোতের টানে পলকের মধ্যেই পানির গভীরে হারিয়ে যান তিনি।

পরিবারের আর্তচিৎকারে দ্রুত ছুটে আসেন আশপাশের নৌকার মাঝি ও স্থানীয় বাসিন্দারা। স্থানীয়রা একযোগে দীর্ঘ সময় তল্লাশি চালিয়ে মিলনকে নিথর অবস্থায় উদ্ধার করেন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

ঘটনার খবর পৌঁছাতেই পুরো এলাকাজুড়ে নেমে আসে তীব্র শোক। রাতে কিশোরগঞ্জ সার্কিট হাউসের সামনে জানাজার নামাজে আত্মীয়-স্বজন, সহকর্মী ও স্থানীয় সাধারণ মানুষের ঢল নামে। চোখের জলে বিদায় জানানো হয় এমন এক পিতাকে, যিনি পিতৃত্বের সর্বোচ্চ পরাকাষ্ঠা রেখে গেছেন। রাত ১০টার দিকে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে করিমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সোহেব খান জানান, “মেয়েকে রক্ষা করতে গিয়ে বাছির উদ্দিন মিলন নামের এক ব্যক্তি পানিতে তলিয়ে যান। পরবর্তীতে স্থানীয়দের সহযোগিতায় তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।”

সহকর্মীদের চোখে মিলন ছিলেন অত্যন্ত বিনম্র, দায়িত্বশীল ও পরোপকারী একজন মানুষ। তবে পেশাগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে গিয়ে তিনি রেখে গেলেন এক বাবার অতুলনীয় আত্মত্যাগের ইতিহাস—যা হাওরের হাওয়ায় এবং মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘদিন অমর হয়ে থাকবে।