
গোপালগঞ্জ প্রতিনিধিঃ স্কুলের আঙিনায় প্রকাণ্ড দেবদারুগাছ। সেই গাছের গুঁড়িতে গামছা দিয়ে পিঠাপিঠি বাঁধা এক কিশোরী ও তরুণ। চারপাশে ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে সহপাঠী, শিক্ষক আর এলাকার উৎসুক মানুষ। অনুনয়-বিনয় সত্ত্বেও প্রকাশ্যেই তাদের ওপর চলল শারীরিক ও মানসিক মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন!
লজ্জাজনক সেই দৃশ্য মুঠোফোনে ধারণ করে ছড়িয়ে দেওয়া হলো নেটদুনিয়ায়। শেষমেশ ভিডিও ছড়ানোর অপমান ও তীব্র মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে বিষ পান করে আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছে নির্যাতনের শিকার ১৩ বছর বয়সী ওই অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী।
গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার একটি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গত ২৮ জুলাই (সোমবার) ঘটে যাওয়া এই ঘটনা ঘিরে পুরো জেলায় বইছে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড়।
স্থানীয় সূত্র ও ছড়িয়ে পড়া ভিডিও থেকে জানা যায়, গত ২৭ জুলাই ওই ছাত্রী ও এক তরুণকে ‘আপত্তিকর অবস্থায়’ দেখা গেছে এমন দাবি করে পরদিন (২৮ জুলাই) দুপুরে তাদের দুজনকে তুলে আনা হয়। কিশোরীকে স্কুলের বাইরে থেকে এবং তরুণকে তার বাড়ি থেকে ডেকে এনে সোজা প্রবেশ করানো হয় বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে।
এরপর কয়েকজন যুবক গামছা দিয়ে তাদের দেবদারুগাছের সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে ফেলে। শুরু হয় প্রকাশ্যে লাঞ্ছনা ও নির্যাতন। বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সহপাঠীদের সামনেই চলে এ বর্বরতা। উপস্থিত কয়েকজন পুরো ঘটনা মোবাইলে ভিডিও করে তা ফেসবুকে আপলোড করে দেয়।
ঘটনায় নয়ন বাড়ৈ, জয় শিকদার ও মিশন রায়সহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। তবে অভিযুক্ত নয়ন বাড়ৈ দায় অস্বীকার করে বলেন, “আপত্তিকর অবস্থায় ধরার পর এলাকার কয়েক যুবক আমার বাড়ির ওপর দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। আমি তাদের বিদ্যালয়ে নিয়ে অভিভাবকদের হাতে তুলে দিই। তবে গাছে বেঁধে নির্যাতনের বিষয়টি আমার জানা নেই।”
শুক্রবার রাতে নির্যাতনের সেই ভিডিও হু হু করে ছড়িয়ে পড়ে ফেসবুকে। মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে চেনা-পরিচিতদের মাঝে। অপমান ও মানসিক যন্ত্রণা সইতে না পেরে ওই ছাত্রী নিজ বাড়িতেই বিষ পান করে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।
পরিবারের সদস্যরা টের পেয়ে তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় প্রথমে স্থানীয় উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যান। সেখানে পরিস্থিতির অবনতি হলে চিকিৎসকরা তাকে গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। বর্তমানে সে হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে দিবালোকে এমন নারকীয় ঘটনা ঘটলেও গত তিন দিনেও কোনো আইনি বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেয়নি স্কুল কর্তৃপক্ষ—এমনই অভিযোগ ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর।
দায় এড়িয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইন্দ্রজিত সরকার বলেন, “ঘটনার দিন আমি বিদ্যালয়ে ছিলাম না। বিষয়টি শুনেছি। আমাদের পরিচালনা কমিটির সভাপতিও ঢাকায় ছিলেন। তিনি ফিরে এলে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে কাশিয়ানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ মাহফুজুর রহমান জানান, “ঘটনাটিতে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে দ্রুত কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
একটি শিশু ও তরুণকে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে এভাবে গাছের সাথে বেঁধে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন এবং সেই ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিয়ে মেয়েটিকে আত্মহত্যার মুখে ঠেলে দেওয়ার বিচার দাবি করেছেন অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকরা। জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
