রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা উস্তার আলী আখঞ্জী, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায়

0
রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা উস্তার আলী আখঞ্জী, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায়

তাহিরপুর প্রতিনিধি: যে মাটির স্বাধীনতার জন্য একাত্তরে হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন,জীবনের শেষ প্রহরে সেই স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতেই রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায় নিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও প্রবীণ শিক্ষক উস্তার আলী আখঞ্জী। মহান মুক্তিযুদ্ধে জীবন বাজি রেখে লড়াই করা এই বীর সন্তান জীবনের দীর্ঘ সময় শিক্ষকতা করে প্রজন্মের পর প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছেন জ্ঞানের আলো,নীতি-নৈতিকতা ও দেশপ্রেমের শিক্ষা। তাঁর মৃত্যুতে টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের তরং গ্রামে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।

১৯৪৬ সালে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নের টাঙ্গুয়ার হাওরসংলগ্ন তরং গ্রামে ছোরাব আখঞ্জীর ঘরে জন্ম নেন উস্তার আলী আখঞ্জী। সেই ঘরের সন্তানই পরবর্তী সময়ে দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে হয়ে ওঠেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৬৪ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন উস্তার আলী আখঞ্জী। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি সমাজে একজন সৎ, ধর্মপরায়ণ, সহজ-সরল ও আদর্শবান মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তিনি অসংখ্য শিক্ষার্থীকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করেছেন।

এরপর আসে বাঙালির ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়—১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীনতার ডাক এলে শিক্ষকতার জীবনকে এক পাশে রেখে দেশের স্বাধীনতা ও মানুষের মুক্তির জন্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন উস্তার আলী আখঞ্জী। মুক্তিযুদ্ধের ৫ নম্বর সাব-সেক্টর টেকেরঘাটে তিনি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর মতো অসংখ্য বীরের সাহস,ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়েই অর্জিত হয়েছে আমাদের প্রিয় লাল-সবুজের বাংলাদেশ।

মুক্তিযুদ্ধের পরও তিনি ফিরে আসেন তাঁর প্রিয় শিক্ষকতা পেশায়।শ্রেণিকক্ষে তিনি শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানই দেননি,তাঁদের মাঝে নীতি, আদর্শ, মানবিকতা ও দেশপ্রেমের শিক্ষাও ছড়িয়ে দিয়েছেন। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তাঁর হাতে গড়ে ওঠা অসংখ্য শিক্ষার্থী আজ সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত।

এলাকাবাসীর কাছে উস্তার আলী আখঞ্জী ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ,সৎ ও বিনয়ী একজন মানুষ। ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা এবং সবার সঙ্গে সহজ-সরল ও আন্তরিক আচরণের কারণে সমাজে তাঁর ছিল আলাদা সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতা।

মৃত্যুকালে তিনি তিন ছেলে ও তিন মেয়েসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন,সাবেক শিক্ষার্থী ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তাঁর দুই মেয়ে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত। এক ছেলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত,বড় ছেলে সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত এবং ছোট ছেলে বর্তমানে পড়াশোনা করছেন।

দাফনের আগে বীর মুক্তিযোদ্ধা উস্তার আলী আখঞ্জীকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়।তাহিরপুর থানা পুলিশের এসআই ইসলাম উদ্দিন এর নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করে।

এ সময় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা প্রকৌশলী জাহিদুল ইসলাম। উপস্থিত ছিলেন উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হারুনউর রশিদ,বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালেক, বীর মুক্তিযোদ্ধা নওশাদ মিয়াসহ অন্যান্য বীর মুক্তিযোদ্ধারা।

এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলী হায়দার,সাবেক উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ফেরদৌস আলম আখঞ্জী, শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মোশহিদ আলম, জনতা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোদাচ্ছির আলম সুবল, তাহিরপুর সদর ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সচিব শফিউল আলমসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।

শেষ বিদায়ের মুহূর্তে স্বজন,সহকর্মী,সাবেক শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন এই বীর সন্তানকে। মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান, দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন এবং আদর্শিক জীবনযাপনের কথা স্মরণ করে সবাই তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করেন।

জানাযায় অংশগ্রহণকারী অনেকেই এই বীর মুক্তিযোদ্ধা উস্তার আলী আখঞ্জীর স্মৃতিচারণ করে বলেন একাত্তরের বীরেরা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিলেন বলেই আজ আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক, হাতে তুলে নিতে পেরেছি লাল-সবুজের পতাকা। সেই বীরদেরই একজন উস্তার আলী আখঞ্জী আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু রণাঙ্গনের সেই সাহসী যোদ্ধার দেশপ্রেম, ত্যাগ,শিক্ষকতার আদর্শ এবং মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসার গল্প টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের মানুষের হৃদয়ে ও নতুন প্রজন্মের মাঝে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে থাকবে।