আইন-বিধিমালা থাকলেও কাগজে-কলমে বন্দী কমিটি: টাঙ্গুয়ার হাওর রক্ষায় জবাবদিহির সংকট

0
আইন-বিধিমালা থাকলেও কাগজে-কলমে বন্দী কমিটি: টাঙ্গুয়ার হাওর রক্ষায় জবাবদিহির সংকট

তাহিরপুর প্রতিনিধিঃ টাঙ্গুয়ার হাওর রক্ষায় আইন আছে,বিধিমালা আছে, রয়েছে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ও আন্তর্জাতিক রামসার সাইটের স্বীকৃতি।সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগও চলছে।কিন্তু এত কিছুর মধ্যেও প্রশ্ন উঠছে হাওরের মাঠপর্যায়ের ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহির কাঠামো নিয়ে।যে বিধিমালায় ইসিএ ব্যবস্থাপনার জন্য উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে নির্দিষ্ট কমিটির কথা বলা হয়েছে, টাঙ্গুয়ার হাওরে সেই কাঠামো কতটা কার্যকর—তার সুস্পষ্ট উত্তর মিলছে না।

প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০১৬অনুযায়ী উপজেলা পর্যায়ে ইসিএ ব্যবস্থাপনা কমিটি এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে ইউনিয়ন সমন্বয় কমিটির ব্যবস্থা রয়েছে।উপজেলা কমিটির নেতৃত্বে থাকেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)।সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ের প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।ইউনিয়ন সমন্বয় কমিটির দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে গ্রাম সংরক্ষণ দলের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ,সমন্বয় এবং তাদের কাজের ক্ষেত্রে উদ্ভূত সমস্যা সমাধানে সহযোগিতা করা।তবে টাঙ্গুয়ার হাওরের ক্ষেত্রে বিধিমালায় নির্ধারিত উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের এসব কমিটি গঠন ও নিয়মিত কার্যক্রমের সুস্পষ্ট সরকারি নথি বা প্রকাশ্য তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।ফলে প্রশ্ন উঠছে—বিধিমালার কাঠামো মাঠে কার্যকর না থাকলে হাওরের তৃণমূল ব্যবস্থাপনা কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে? সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ায় কারা যুক্ত,তাদের দায়িত্ব কী এবং সেই সিদ্ধান্তের জন্য জবাবদিহি করবে কে?অন্যদিকে টাঙ্গুয়ার হাওর কেন্দ্রীয় সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি ও এর সঙ্গে যুক্ত গ্রামভিত্তিক কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে রয়েছে।স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও এসব কাঠামোর সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে সম্পৃক্ততা থাকতে পারে।তবে এ ধরনের সম্পৃক্ততা আর বিধিমালায় নির্ধারিত ইসিএ ব্যবস্থাপনা কমিটিতে জনপ্রতিনিধি হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্ব—দুটি বিষয় এক নয়।এখানেই তৈরি হচ্ছে মূল প্রশ্ন।একদিকে রয়েছে বিধিমালায় নির্ধারিত ব্যবস্থাপনা কাঠামো, অন্যদিকে মাঠে বিদ্যমান স্থানীয় ও সমবায়ভিত্তিক কাঠামো।এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় কোথায়, দায়িত্বের সীমারেখা কী এবং সিদ্ধান্তের দায়ভার কার—তা স্পষ্ট না হলে হাওর ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহির ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

স্থানীয় বাসিন্দা অখিল তালুকদার বলেন,টাঙ্গুয়ার হাওর রক্ষায় নানা উদ্যোগের কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।বিধিমালায় উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে যে কমিটির কথা বলা হয়েছে, সেগুলো কার্যকর না থাকলে হাওরের সমস্যা চিহ্নিত করা,স্থানীয় মানুষের মতামত নেওয়া এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সমন্বয় তৈরি করা কঠিন।হাওর রক্ষায় শুধু আইন ও প্রকল্প থাকলেই হবে না,আইন অনুযায়ী দায়িত্বশীল কাঠামোও কার্যকর করতে হবে।

স্থানীয় কলাগাঁও গ্রামের বাসিন্দা সাদ্দাম হোসেন বলেন,টাঙ্গুয়ার হাওরের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি জলাভূমি রক্ষায় স্থানীয় মানুষকে সম্পৃক্ত করে একটি কার্যকর ব্যবস্থাপনা কাঠামো থাকা জরুরি। বিধিমালায় কমিটি গঠনের কথা থাকলেও তা বাস্তবে কতটা কার্যকর,সেটি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।হাওরের সমস্যা ও সম্ভাবনা সবচেয়ে ভালো বোঝেন হাওরপাড়ের মানুষ।তাই তাদের মতামত ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোর কার্যক্রমও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হওয়া প্রয়োজন।

এ ব্যাপারে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সিএনআরএসের প্রকল্প উন্নয়ন কর্মী ছাইফুল চৌধুরী বলেন,টাঙ্গুয়ার হাওর রক্ষা করতে হলে শুধু আইন, প্রকল্প কিংবা অভিযান থাকলেই হবে না; মাঠে একটি কার্যকর ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা থাকতে হবে। কে কী দায়িত্ব পালন করবে,স্থানীয় মানুষ কীভাবে যুক্ত থাকবে এবং কোনো সমস্যা হলে কার কাছে জবাবদিহি করতে হবে—এসব বিষয় পরিষ্কার থাকা দরকার।হাওরপাড়ের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে সরকারি দপ্তর ও সংশ্লিষ্ট সবাই সমন্বিতভাবে কাজ করলে হাওরের অনেক সমস্যা সহজেই মোকাবিলা করা সম্ভব।বিধিমালায় যে কমিটি ও ব্যবস্থাপনার কথা বলা হয়েছে, সেগুলো কার্যকর ও সক্রিয় থাকলে হাওর রক্ষার কাজ আরও সুশৃঙ্খল ও ফলপ্রসূ হবে।

টাঙ্গুয়ার হাওরের বাস্তবতায় পরিবেশ রক্ষায় শুধু অভিযান বা বিচ্ছিন্ন প্রকল্প দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন। অবৈধ মাছ শিকার, নিষিদ্ধ জাল,প্লাস্টিক ও বর্জ্য,পর্যটনের চাপ,নৌযানের অনিয়ন্ত্রিত চলাচলসহ নানা সমস্যা মোকাবিলায় স্থানীয় পর্যায়ে একটি সুস্পষ্ট ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা কাঠামো প্রয়োজন।কারণ ব্যবস্থাপনা থাকলেই যথেষ্ট নয়—কে সিদ্ধান্ত নেবে,কে বাস্তবায়ন করবে, কে তদারকি করবে এবং ব্যর্থ হলে কার কাছে জবাব দিতে হবে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তরও স্পষ্ট থাকা জরুরি।

টাঙ্গুয়ার হাওর জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি জলাভূমি।তাই ইসিএ ঘোষণা, বিধিমালা ও নানা প্রকল্পের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের ব্যবস্থাপনা কাঠামোকেও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করা প্রয়োজন।নইলে ব্যবস্থাপনা থাকলেও তার দায়িত্বের লাগাম কার হাতে—সেই প্রশ্ন থেকেই যাবে।