এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির: সুন্দরবন থেকে ফিরে: সুন্দরবনের উপকূলে গহিন অরণ্যের ভয়ংকর অন্ধকার জগৎ ও দস্যুবৃত্তি ছেড়ে আবারও স্বাভাবিক ও সুস্থ জীবনে ফিরে এসেছেন কুখ্যাত বনদস্যু ‘নানা ভাই’ বাহিনীর প্রধান জাহাঙ্গীর মোড়ল ওরফে নানা ভাইসহ ১২ জন সক্রিয় সদস্য। আজ বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোন মোংলা সদর দপ্তরে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা দিয়ে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেন। তবে সুন্দরবনের ১১টি বাহিনীর সদস্যরা পুরো সুন্দরবনে দাপিয়ে বেড়ালেও ৭টি বাহিনী তাদের সদস্যদের নিয়ে আতœসমর্পন করলো। দুটি বাহিনী বিলুপ্ত ও এখনও রাজু করিম শরিফ বাহিনীর সদস্য অস্ত্র নিয়ে সুন্দরবনে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তাদেরও নিমূর্লে কোস্ট গার্ডসহ অন্যান্য বাহিনীর অভিযান চলমান রয়েছে।
কোস্ট গার্ডের পশ্চিম জোন সুত্রে জানায়, সুন্দরবনের সুনির্দিষ্ট ও দুর্গম এলাকাগুলোতে কোস্ট গার্ডের ধারাবাহিক বিশেষ অভিযানের মুখে পড়ে বনদস্যুরা। একপর্যায়ে সুন্দরবনের ধানসিদ্ধির চর এলাকায় কোস্ট গার্ডের বিশেষ অপারেশন দলের কাছে কোণঠাসা হয়ে বাহিনীর প্রধান জাহাঙ্গীর মোড়ল ওরফে নানা ভাইসহ দলের সক্রিয় ১২ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় এবং তাদের হেফাজতে নেওয়া হয়।
বৃহস্পতিবার দুপুরে কোস্ট গার্ড মোংলা সদর দপ্তরে আয়োজিত আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে দস্যুরা একে একে তাদের ব্যবহৃত ভারী অস্ত্র ও সরঞ্জাম কোস্ট গার্ড কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেন। এ সময় তাদের কাছে থাকা ১টি এইট শুটার, ১টি সিক্স শুটার, ১টি ফোর শুটার, ১টি সাইড হেমার, ১টি বোল্ট অ্যাকশন পিস্তল, ২টি এম থ্রী গ্যাস গান, ২টি ৭.৬৫ মি.মি. পিস্তল, ২টি ওয়ান শুটার, ২টি এয়ার গান, ২১২ রাউন্ড তাজা কার্তুজ, ২৯ রাউন্ড ফাঁকা কার্তুজ, ২০ রাউন্ড ৭.৬৫ মি.মি. পিস্তল বল, ০৫ রাউন্ড ৮ মি.মি. তাজা গোলা, ৪১৩ রাউন্ড এয়ারগান গোলা, ৪ টি পিস্তল ম্যাগাজিন, ২টি এয়ারগান ম্যাগাজিন ও চার্জারসহ ৬টি ওয়াকিটকি কোস্ট গার্ডের নিকট জমা দেন দস্যুরা। এছাড়াও তাদের যাগাযোগ সচল রাখার জন্য ব্যবহৃত ৬টি ওয়াকিটকিসহ দস্যুবৃত্তির কাজে ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ অন্যান্য আনুষঙ্গিক মালামাল জমা দেয় দস্যুরা।
আত্মসমর্পণকারী দস্যু জাহাঙ্গীর মোড়ল ওরফে নানা ভাই (৩৬), সাইফুল্লাহ মোড়ল (৩৯), এখলাছুর রহমান (৩৮), রবিউল ইসলাম (৩৫), মফিজুল ইসলাম (৩৫), আজিম উদ্দিন গাজী (৩৭) ও আব্দুর রহমান শেখ (৩৬) খুলনা জেলার পাইকগাছা ও ডুমুরিয়া থানার বাসিন্দা এবং শফিকুল ইসলাম (৫৩), মিন্টু গাজি (৩৯), আজিজুল গাজী (৩৫) ও শাহজাহান মালী (৩৫) সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর থানার বাসিন্দা এবং আজিজুর রহমান (৪৫)।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানায়, আত্মসমর্পণকারী এই ১২ জন দস্যুদের বাড়ি সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর এবং বাগেরহাট জেলার রামপাল থানার বিভিন্ন দুর্গম এলাকায়। তারা দীর্ঘদিন যাবৎ সুন্দরবনের বুক চিরে বিভিন্ন নদী ও খালে আস্তানা গেড়ে মৎস্যজীবী, বাওয়ালি (গোলপাতা সংগ্রহকারী) এবং মৌয়ালদের জিম্মি করে আসছিল। নিরীহ জেলেদের অপহরণ করে লক্ষ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ আদায় এবং ডাকাতিই ছিল এই কুখ্যাত বাহিনীর মূল কাজ। তাদের চরম অত্যাচারে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল মানুষ সবসময় আতঙ্কে ও নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাতো।
আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে বাগেরহাট জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি, র্যাব, জেলা পুলিশ প্রতিনিধি এবং কোস্ট গার্ড বাহিনীর ঊর্ধ্বতন পদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের বিসিজিএস কামারুজ্জান’র নির্বাহী কর্মকর্তা কমান্ডার মোঃ মানসুরুন মাহ্দীন জানান, সুন্দরবনকে জলদস্যু ও বনদস্যুমুক্ত করে জেলেদের শতভাগ অর্থনৈতিক ও শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি বজায় রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় এ পর্যন্ত সুন্দরবনের গুররু¡পূর্ণ ৬টি বড় বাহিনী আত্মসমর্পণ করে অন্ধকার জগৎ থেকে আলোর পথে ফিরে আসলো।
তিনি আরো বলেন, কোস্ট গার্ডের গোয়েন্দা তথ্যে উঠে এসেছে, সুন্দরবনের গহিন অরণ্যে এখনো রাজু ও করিম শরিফ বাহিনী নামে আরও ২টি বনদস্যু বাহিনী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এবং জেলেদের ওপর অত্যাচার চালাচ্ছে। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে কঠোর হুঁশিয়ারি দেয়া হয়, বাকি দুটি বাহিনীকেও অতি দ্রæত আইনের আওতায় আনা হবে অথবা তাদের নির্মূল করতে কঠোর অভিযান ও গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত থাকবে। আত্মসমর্পণকারী দস্যুদেরকে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় আইনি ও মানবিক সহযোগিতা দেওয়া হবে বলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়।
২০১৮ সালে ১ নভেম্বর দস্যু মুক্ত সুন্দরবন ঘোষনা করা হলেও সাড়ে ৬ বছর পর গত ২৪ সালের ৫ আগষ্টের পর পুনরায় সুন্দরবনে বন ও জলদস্যুর আনাগোনা শুরু হয়। তাই দস্যু দমনে কোস্ট গার্ডের নেতৃত্বে “অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন” ও “অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড” নামে দুটি বিশেষ অভিযান শুরু করে।জেলে-মৌয়ালদের জিম্মির অভিযোগ
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাষ্য, আত্মসমর্পণকারী সদস্যরা দীর্ঘদিন সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী ও খালে আস্তানা গেড়ে মৎস্যজীবী, বাওয়ালি ও মৌয়ালদের জিম্মি করে আসছিলেন। জেলেদের অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় ও ডাকাতির অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আদালতে বিচারিকভাবে প্রমাণিত তথ্য এবং অভিযোগের বর্তমান আইনি অবস্থার বিষয়টি পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
কোস্ট গার্ডের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনে একসময় ১১টি দস্যু বাহিনীর তৎপরতার কথা জানা যায়। এর মধ্যে সাতটি বাহিনীর সদস্য বিভিন্ন সময়ে আত্মসমর্পণ করেছেন। দুটি বাহিনী বিলুপ্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। বর্তমানে রাজু ও করিম শরিফ নামে আরও দুটি বাহিনীর সদস্যদের সক্রিয় থাকার তথ্য দিয়েছে কোস্ট গার্ড।
অর্থাৎ ১১টি বাহিনীর হিসাবটি দাঁড়াচ্ছে—৭টি বাহিনীর আত্মসমর্পণ, ২টি বিলুপ্ত এবং ২টি বাহিনী সম্পর্কে এখনও সক্রিয় থাকার তথ্য।
২০১৮ সালের ১ নভেম্বর সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আবারও বন ও জলদস্যু তৎপরতার তথ্য সামনে আসে। এরপর দস্যু দমনে কোস্ট গার্ডের নেতৃত্বে ‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ এবং ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ নামে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের বিসিজিএস কামারুজ্জামানের নির্বাহী কর্মকর্তা কমান্ডার মো. মানসুরুন মাহ্দীন বলেন, সুন্দরবনকে বন ও জলদস্যুমুক্ত করে জেলেদের অর্থনৈতিক ও শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তিনি জানান, গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী সুন্দরবনের গহিন অরণ্যে রাজু ও করিম শরিফ বাহিনীর সদস্যদের তৎপরতার তথ্য রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত থাকবে।
নানা ভাই বাহিনীর প্রধানসহ ১২ সদস্যের আত্মসমর্পণ সুন্দরবনের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও এখনও দুটি বাহিনীর সক্রিয় থাকার তথ্য উদ্বেগ তৈরি করেছে। সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাকি সশস্ত্র সদস্যদেরও আইনের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
আত্মসমর্পণকারীদের পুনর্বাসনের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় আইনি ও মানবিক সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
দস্যুদের একটি অংশ অস্ত্র জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছে। এখন বড় প্রশ্ন—সুন্দরবনের গহিন অরণ্যে সক্রিয় বলে দাবি করা অবশিষ্ট সশস্ত্র সদস্যদের তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ করা যাবে কবে?

