কলাপাড়া প্রতিনিধি : পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় মা ছেলেকে নির্যাতনের ঘটনায় শিশু জিসানকে(১৩) এবার রক্তের নাতি দাবী করেছেন আলোচিত সেই বিএনপি নেতা। এছাড়া ঘটনার রাতে চুরির দায়ে পুলিশ ওই শিশুকে হেফাজতে নেয়নি বলে তিনি মায়ের সামনেই শাসন করেছেন বলে দাবী করছেন তিনি। তবে পুলিশ বলছে,অ্যাড. হাফিজুর রহমান চুন্নু তালুকদার এ এসআই মিজানকে ওই শিশুর বিরুদ্ধে মৌখিক ভাবে অভিযোগ জানালে তাকে থানার ডিউটি অফিসারকে অবহিত করতে বলেছেন।
এ ঘটানার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তোলপাড় সৃষ্টি হয় নেট দুনিয়ায়। তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারিরা। এমনকি বিএনপি দলীয় শত শত নেতাকর্মীরাও নারী ও শিশু নির্যাতনের বিচার দাবি করেন ফেসবুক মাধ্যম জুড়ে। তবে ঠিক কি ঘটেছিল সেদিন রাতে? ঘটনার সত্যতা জানতে প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে সরেজমিন অনুসন্ধানে।
অনুসন্ধানে জানাযায়,উপজেলার চাকামইয়া ইউনিয়নে উপজেলা বিএনপির সদস্য আবদুল হাই তালুকদারের বাড়ি থেকে(১৮ সেপ্টেম্বর) একটি মানিব্যাগ চুরির অভিযোগ ওঠে একই এলাকার মৃত বাচ্চু হাওলাদারের পুত্র ১৩ বছর বয়সী জিসান হাওলাদারের বিরুদ্ধে। পরে ওদিন রাতেই জিসানের বাড়িতে গিয়ে তাকে ডেকে নিজ বাড়িতে নিয়ে আসেন আবদুল হাই। এসময় শিশুটির মা নাজমা বেগমও ওই বাড়িতে যান।
কিন্তু মানিব্যাগের বিষয়টি জিজ্ঞাসাবাদের কথা শুনে অদূরের ঘর থেকে ওই বাড়িতে প্রবেশ করেন উপজেলা বিএনপির সম্পাদক অ্যাডভোকেট হাফিজুর রহমান চুন্নু তালুকদার। পরে তিনি পুলিশে ফোন দিলে পুলিশ না যাওয়ায় মুরগী তারানো বাঁশের কঞ্চি দিয়ে জিসানকে মারধর করেন। এসময় গোপনে মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করেন শিশুর মা নাজমা বেগম। যা পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তুমুল সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শী বয়োবৃদ্ধা ফরিদা বেগম বলেন, ঘটনার সময় চুন্নু তালুকদার তার নাতিকে টুনি দিয়ে (শুকনো বাঁশের কঞ্চি) জিসানকে ৬/৭ টি আঘাত করে। এরপর তার স্ত্রী নাজমুন নাহার কঞ্চি টেনে ধরেন। যা ভিডিওতে রয়েছে। এই নারীর দাবী জিসান এলাকায় গত ১ বছরে একাধিক চুরির ঘটনা ঘটিয়েছে। আর জিসান এই বিএনপি নেতার ফুফাতো বোনের ছেলের ঘরে ছেলে হওয়ায় স্থানীয়রা অভিযোগ নিয়ে তালুকদার বাড়িতেই আসতেন। যা নিয়ে বিরক্ত ছিল চুন্নুর পরিবার। কিন্তু সেই চুন্নুর বাড়িতেই চুরি করছে জিসান। তাই জিসানের চুরির স্বভাব ভালো না হওয়ায় রাগে পুলিশের কাছেও ফোন দেওয়া হয়। কিন্তু বয়স কম হওয়ায় পুলিশ না নেওয়ায় চুন্নু উকিল নিজে ঐ কঞ্চি দিয়ে পিটায়। তবে সেটাও ভুল হয়েছে বলে জানান ফরিদা বেগম।
এই নারী আরও জানান, স্থানীয় বেশ কয়েকটি দোকানসহ এক প্রবাসীর বাড়িতে চুরির ঘটনার পর জিসানকে শিকল পড়িয়ে বাড়িতেই রাখতেন তার মা। কিন্তু সুযোগ পেলেই চুরির সঙ্গে জড়িয়ে পরে এই ছেলে। যা নিয়ে স্থানীয় অনকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
অপরদিকে বিএনপি নেতা চুন্নুর স্ত্রী মোসা নাজমুন নাহার কান্না জড়িত কন্ঠে জানান, দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি এমন কিছু ঘটে যাবে? তিনি বলেন, জিসানের পরিবারের পাশে সব সময় আমরাই থাকি। সুবিধা অসুবিধা সব খোঁজ নেওয়া হয়। জিসান তার নারিকেল বাগান থেকে একাধিকবার নারেকেল চুরি, কাঠাল চুরি,শশা চুরি সহ বিভিন্ন সময় পুকুর থেকে মাছ চুরিও করেছে। রাতেও গাছে উঠে নারিকেল চুরি করে পালিয়ে যায়। মৃত্যুর ভয়ও করে না। কিন্তু সেদিন আমার স্বামী শহর থেকে বাড়িতে আসলে হাইয়ের মানিব্যাগ চুরির খবর শুনে সেখানে যায়। প্রথমে পুলিশকে দিতে চাইলেও, তারা না নিলে পরে তিনি বিড়াল,মুরগী তারানোর লাঠি দিয়ে কয়েকটি পিটুনি দিলে আমি আর মারতে দেয়নি।
তার দাবী জিসানকে মারার সময় তার মা নিজেই শাসন করতে বলেছে। কিন্তু পরে শুনি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে নাজমা আবোলতাবোল কথা বলছে। এই গৃহবধূর দাবী নাজমা ভাগ্নে বউ এবং জিসান নাতি। ঘরে সবাই এয়াতিম শিশু হিসেবে আদর করে,ভালোবাসে। শুধু চুরি থেকে ফেরাতে ওকে শাসন করা হয়েছে এ কথা বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
জিসানের চুরির ঘটনা সত্যতা যাছাইয়ে সঙ্গে কথা হয় স্থানীয় দোকানী রাসেলের সঙ্গে তিনি বলেন, তার স্ত্রী মারা যাওয়ার দিনে জানাজার সময় তার দোকান থেকে বিস্কুট সহ বহু জিনিস চুরি করে নিয়ে গেছে জিসান।
অপরদিকে স্থানীয় বৃদ্ধ মুজাফফর গাজী বলেন, সম্প্রতি সময়ে রাতের আধারে তার পকেটে হাত দিয়ে টাকা চুরির চেষ্টা চালায় জিসান। পরে তিনি চর মেরে তাকে দূরে তাড়িয়ে দেন।
এছাড়া স্থানীয় একাধিক মানুষের অভিযোগ, বেশকিছু ছেলেদের সঙ্গে নিয়ে প্রকাশ্যে দোকানে বসে ধুমপান করে জিসান। আর সুযোগ পেলেই বিভিন্ন দোকান থেকে সিগারেট, টাকা চুরির ঘটনা ঘটিয়েছে একাধিক বার। একই এলাকার কিশোর ইমন জানায়, জিসান তার বন্ধু। কিন্তু তাকে চুরির বিষয়ে নিষেধ করলেও জিসান জানায় চুরি না করলে খাব কি? টাকা কেউ দেবে না। তাই সে চুরি করে, তাকে জিসান এমন কথা বলেছে বহুবার।
এদিকে জিসানের অভিযোগ, ওইদিন রাতে হাই তালুকদারের কাজের লোক আতিকের সঙ্গে বাড়িতে প্রবেশ করলেও সে মানিব্যাগ চুরি করেনি। একটা খালি মানিব্যাগ সে পেয়েছে কিন্তু তাতে কোন টাকা পয়সা ছিল না। তাকে অন্যায় ভাবে মারা হয়েছে।
তবে অভিযুক্ত হাই তালুকদারের দাবী জিসানকে ধরে নিয়ে আসার পর তার মা তাদের বাড়ি থেকে মানিব্যাগ আর কাগজপত্র ফেরত নিয়ে আসে। কিন্তু সেখানে ৫ হাজার টাকা থাকলেও তা ফেরত দেয়নি। শুধু কয়েকটি কয়েন সহ কাগজপত্র ফেরত দিয়েছে। তিনি বলেন, জিসানের বাবা আমার ভাগ্নে,সে বেচে নেই। কিন্তু মৃত্যুর আগে ৫০ হাজার টাকা জমি বন্ধকীর জন্য দিয়ে গেছে। বিনিময়ে সেই জমি চাষ করছে ভাগ্নে বউ নাজমা। এখানে জমির বিষয় কোন ঘটনা ঘটেনি। এটা ষড়যন্ত্র করে এখন মিথ্যা বলছে। আমরা কোনদিন অস্বীকার করিনি যে ওরা জমি পাবে না। চুরির বিষয়টি ভিন্ন দিকে প্রভাবিত করা হয়েছে। কিন্তু জিসানকে কেন মারলেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এটা নাতির অধিকারে শাসন করেছি,তবে ভুল হয়েছে।তার মাকে মারার বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন তিনি।
তবে ভিডিওতে দেখতে পাওয়া নির্যাতনকারী হাফিজুর রহমান চুন্নু তালুকদার বলেন, আপনারা আমাকে মেরে ফেলুন। আমার নাতিকে আমি চুরি থেকে ফেরাতে অধিকার নিয়ে শাসন করেছি। ওর বিরুদ্ধে এতোদিন যতগুলো অভিযোগ এসেছে তা আমি আমার পরিবার সামনে পরে সামাল দিয়েছি। গোটা পরিবারটাকে সব ধরনের সাপোর্ট দিয়ে আসছি। ও আমার রক্তের নাতি হয়। অধিকাংশ সময় আমার বাড়িতে কাটায়। কিন্তু নাজমা কেন কার কুপরামর্শে মিথ্যা বলছে তা আমি জানিনা।জিসানের মা নিজেই আমাকে শাসন করতে বলেছে। তিনি আরও বলেন, আমি চাকামইয়ার দায়িত্বে থাকা পুলিশ অফিসার মিজানকে ফোন দিয়েছি। কিন্তু তিনি আমাকে বয়স কমের কথা বলে চড়থাপ্পড় দিয়ে ছেড়ে দিতে বলেছেন। তাহলে আমার কি করার ছিল? আর রাগের মাথায় মারাটাও ভুল হয়েছে বলে স্বীকার করেন এই নেতা। তবে শিশুকে গোয়াল ঘরে বেধে রাখা ও তার মাকে মারধরের কথা অস্বীকার করেন তিনি।
কলাপাড়া থানার এ এসআই মিজান জানান, ঐদিন রাতে আমাকে উকিল সাহেব ফোন দিয়েছেন সত্যি। কিন্তু আমি স্বাক্ষী দিতে দূরে অবস্থান করছিলাম। তাই তাকে থানার ডিউটি অফিসারকে কল করতে বলেছি। তবে শিশুকে চর থাপ্পড় দিয়ে ছেড়ে দেওয়ার কথা অস্বীকার করেন এই পুলিশ সদস্য।
এদিকে কলাপাড়া হাসপাতালে এখনও চিকিৎসাধীন রয়েছেন শিশু জিসান ও তার মা নাজমা বেগম।মোসা নাজমা বলেন, ছোটখাটো চুরির ঘটনায় অতিষ্ট হয়ে মাঝেমধ্যে জিসানকে তিনি শিকলে বেঁধে রাখতেন এবং চুন্নু মিয়া আত্নীয় এ কথা সত্য। কিন্তু ওইদিন চুরির অপবাদ দিয়ে তার ছেলেকে এবং তাকে মারধর করা হয়েছে। এসময় কৌশলে তিনি ভিডিওটি করেছেন। এমনকি তাদের ভয়ে তিনদিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতেও আসেননি। এঘটনার বিচার দাবীর পাশাপাশি তার জমির কাগজও চেয়েছেন তিনি।
কলাপাড়া থানার ওসি মো নজরুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনা শুনেছি তবে এখনও কোন লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি।লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনি ব্যবস্হা গ্রহণ করা হবে।

